
#ছায়া_মানব
#সাথী_ইসলাম
৭৬.
মাহতিম অনেকটা সুস্থ বোধ করে। চোখের অন্ধকার ছায়াটা চলে গেছে। অনেকটা তাজা মনে হচ্ছে নিজেকে। উঠতে চাইলে অহনা বাঁধা দিয়ে আরো কিছুটা সময় শুইয়ে রাখে।
মোড়লের রাগ গলে আসে। তিনি রুমির মতামত জানতে চায়। শেষ পর্যন্ত রুমি মত দিয়ে দেয়। রুমির পরিবারকে ডাকা হয়।
মোড়ল বাইরে গিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে দেয় আরিশ এবং মতির বিয়ে একই দিনেই হবে। একদিনে দুই ভাইয়ের বিয়ে। সবাই এমন সিদ্ধান্তের কারণ জিজ্ঞেস করলে উনি এড়িয়ে গিয়ে বলল,' ছেলে মেয়েরা একে অপরকে ভালোবাসে, আমি চাই সেটা পূর্ণতা পাক। বড়রা মেনে না নিলে বাচ্চারা ভুল করে বসে। আমি চাই না মতি কোনো ভুল করুক, তাই এই সিদ্ধান্ত নিলাম। আশা করি কারো কোনো আপত্তি থাকবে না।'
রুমির পরিবার সহজেই রাজি হয়ে যায়। যদিও সময়টা ঠিক না তবুও রুমি কাকুতি মিনতি করে ঠিক করে নেয়।
অহনা বেড়িয়ে আসে। মাহতিম সুস্থ থাকায় সেও আসে। হলুদ ছোঁয়ানোর অনুষ্ঠান শুরু হয়। একসাথে আরিশ-অহনা এবং মতি-রুমির।
পরদিন সকালে অহনা এবং রুমিকে একসাথে গোসল করানো হয়। অহনার মনোযোগ ছিল মাহতিমের দিকে। সে একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। অহনাকে গোসল শেষে পরিপাটি করার জন্য নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। রুমিকেও অহনার ঘরে এনে রাখা হয়।
অহনা চুপি চুপি রুমির কাছে সত্যি জানতে চায়। কেন মোড়ল হঠাৎ তাদের বিয়ের ঘোষণা করে, এমন কি করেছিল তারা?
রুমি কিছু বলতে চায় না। মুখ ভার করে থাকে। মতির প্রতি তার আলাদা একটা ঘৃণা জন্ম নিয়েছে তবুও সে নিজের কথা ভেবেই এই বিয়েতে রাজি হয়েছে। যদি পরবর্তীতে কোনো সমস্যা হয় তাহলে তার সম্মানে আ'ঘাত লাগবে তাই সহজেই রাজি হয়ে যায়। কিছুটা বিশ্বাস আছে মতির উপর, যদি সে ভালো হয়ে যায়।
অহনা জোর করার পর রুমি সব সত্যিটা বলে দিল। অহনা রেগে যায়,' এত কিছু ঘটে গেল, আর তুই ঢ্যাংঢ্যাং করে রাজী হয়ে গেলি?'
অহনা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে গেছে। তার রাগান্বিত উক্তি শুনে সবাই সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকায়। রুমি অহনাকে শান্ত করার জন্য বলল,', দোষ আমারো ছিল। আমিও দোষ করেছি। আমি তার প্রতি দুর্বল ছিলাম।'
' কিই? এতকিছূ ঘটে গেল, আর আমি এখন জানতে পারলাম। আমাকে তুই কখনো কিছু বলিসনি। কেন?'
' কি বলতাম আমি? আমি নিজেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। এরই মাঝে এই বিষয়টা ঘটে গেল। আমি নিজের এবং আমার পরিবারের সম্মান বাঁচাতে রাজি হয়ে গেছি। তবে আমার বিশ্বাস মতি ঠিক হয়ে যাবে। এইটুকু বিশ্বাস আমি করতেই পারি।'
মতি এবং আরিশ অহনার ঘরে প্রবেশ করে। বরকে বিয়ের আগে এভাবে বউয়ের কাছে আসতে দেখে মহিলারা হাসাহাসি করে।
একজন বলল,' আরিশ, আর কিছুক্ষণতো অপেক্ষা করতে পারতে। তর সইছে না নাকি?'
মুখে আঁচল গুঁজে আবারো হেসে উঠে। মূলত সে আসতে চায়নি। মতি এসেছে রুমির সাথে দেখা করবে বলে। কাল থেকে রুমি তার সাথে একটাও কথা বলেনি। একদম সুযোগ পাচ্ছে না। তাই এভাবে কথা বলতে এলো। সঙ্গে আরিশকে নিয়ে এসেছে, যেন কেউ বাঁধা না দেয়।
আরিশ সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,' আপনারা যদি একটু বাইরে যেতেন তাহলে ভালো হতো।'
তন্দ্রা উঠে এসে আরিশের কান ধরে বলল,' তাই বুঝি বাপধন? এখনো বিয়ে হয়নি এখনই আমাদের বের করে বউয়ের সাথে আলাদা কথা বলতে চাও?'
' না চাচি, এমন কোনো ব্যাপার না। তবে কিছু কথা বিয়ের আগেই সেরে নেওয়া ভালো, না হয় পরে আফসোস থেকে যায়।'
' আচ্ছা, ঠিক আছে।'
তন্দ্রা সকল মহিলাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। আরিশ অহনাকে বলল,' তুমি বারান্দায় চলে আসো, ওদের একাই কথা বলতে দাও। বিয়ের আগে বোঝাপড়া করে নিক, না হয় প্রথম দিন থেকেই অশান্তি লেগে থাকবে।'
অহনা মাথা নাড়িয়ে আরিশের সাথে বারান্দায় চলে আসে। পশ্চিমে বারান্দাটা। অহনা দূরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আরিশও কোনো কথা না বলে যতদূর চোখ যায় দেখতে থাকে।
মৃদু বাতাস বইছে। সকালের এই স্নিগ্ধ বাতাস মনের আরিশের গহীনে কড়া নাড়ে। সে অহনার দিকে তাকায়। অহনার চোখে মুখে লাবণ্য ছড়িয়ে রয়েছে। সদ্য গোসল করে আসায় তার ভেজা চুলের আকর্ষণটা আরো বেশি। আরিশ মুগ্ধ নয়নে দেখে। বেহায়া মন তার, দেখেও সাধ মিটে না। বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে এক দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে।
মতি কোনো কিছু না ভেবেই রুমির হাতজোড়া চেপে ধরে কেঁদে উঠে,' এভাবে মুখ ফিরিয়ে থাকবে না। আমার খুব কষ্ট হয়। আমি সত্যি খুব খারাপ ছেলে, আমি তোমার সাথেও অন্যায় করলাম। কিন্তু এটাকে তুমি অন্যায় হিসেবে ধরে নিও না। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমাকে তুমি হাজারটা শাস্তি দাও আমি মাথা পেতে নেব কিন্তু ইগনোর করোনা। আমার সহ্য হয়না। তোমার চোখে আমি নিজের জন্য অনেক ভালোবাসা দেখেছি, সারাজীবন সেটাই দেখতে চাই। রাগ করে থেকো না আমার উপর।'
রুমি হাত ছাড়িয়ে নিতেই মতি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে,' এবার বলো, তুমি কি আমাকে অনুভব করতে পারছো না? তোমার মনে কি আমার জন্য কোনো ফিলিংস আসছে না? আমি জানতে চাই, বলো!'
' ছাড়ুন আমাকে আর চলে যান।'
' তুমি শান্ত হয়ে একবার অনুভব করো আমাকে। শুধু একবার। আমার ছোঁয়া তোমার খারাপ লাগবে না। কারণ ভালোবাসার ছোঁয়া কখনো খারাপ হয়না।'
রুমি চোখ বন্ধ করে নেয়। দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে শীতল মাটিতে। সকল রাগ তার পানি হয়ে গেছে। বেহায়া ভালোবাসা সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেয়, এটা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। রুমিও জড়িয়ে ধরে শক্ত করে,
' আপনাকে আমি বিশ্বাস করি কি করে? আপনিতো নিজেকে সামলাতেই পারেন না। পরবর্তীতে আবার কোনো মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবেন না, সেটা কি করে বিশ্বাস করি আমি?'
মতি দৃঢ় কন্ঠে জবাব দেয়,' জীবনে আর কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকাব না। যদি তাকাই তাহলে আমাকে মে'রে দিও বা পাবনা রেখে এসো। আমি প্রমাণ পত্রে সিগনেচার করে দেব। আমার কথার দাম আমি দেব। জীবনে বহু অন্যায় করেছি। জেনে না জেনে হাজার জনকে কষ্ট দিয়েছে, আর দেব না। আর একবার সুযোগ দিয়ে দেখো, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো হাজবেন্ড হয়ে দেখাব। তোমার বরকে দেখে সবাই হিংসে করবে দেখে নিও।'
'' সত্যিতো!'
' এক হাজারবার সত্যি। আমি এতদিন মিথ্যের পেছনে ঘুরে বুঝেছি সত্যিটা কেমন হয়।'
' এবার থেকে সত্যিকারের ভালোবাসবেন?'
'সবসময়।'
মাহতিম অহনার পাশে এসে দাঁড়ায়। অহনা আরিশের দিকে এক নজর তাকিয়ে মাহতিমকে বলল,' আমার ভয় হচ্ছে, তুমি কি সত্যি আজ আমাকে নিয়ে যাবে? আমি তোমার কোনো ভাবগতি দেখছি না।'
মাহতিম মৃদু হাসে,' একটু পর সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি, তুমি, আমাদের সবার সুখের সন্ধানের সমাপ্তি ঘটবে।'
' আমি তোমার বাঁকা কথা বুঝি না। আমাকে বলো, তুমি কি ইভিল স্পিরিটের ব্যবহার করেছ?'
আরিশ অহনাকে বলল,' হ্যাঁ। চিন্তা করো না।'
মাহতিম আরিশের চোখে করুণাভরে তাকায়। ভেতরটায় কতটা দহন হচ্ছে তা হয়তো কেউ টের পাচ্ছে না। আরিশ মাহতিমের কাঁধে হাত রেখে বলল,' আমি যাই।'
অহনা অগ্নিশর্মা হয়ে মাহতিমকে বলে,' আমি খেয়াল করে দেখছি, তুমি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছ না। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে একবার বলো সত্যিটা কি? আমার ভীষণ হাঁসফাঁস লাগছে।'
মাহতিম চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নেয়। অহনার হাতজোড়া আলিঙ্কন করে বলল,' তোমার চোখের দিকে তাকালে মনে হয় এই বুঝি ভস্ম হয়ে যাব।'
' কেন তোমার এমন মনে হয়?'
মাহতিম কথা ঘুরিয়ে বলল,' ভেজা চুলে তোমাকে কতটা সুন্দর লাগে, তুমি কি সেটা কখনো খেয়াল করেছ?'
অহনা কিছু বলল না। বেশ বুঝতে পেরেছে মাহতিম কথা ঘুরাচ্ছে। মাহতিম আবার বলল,' কখনো কি ভেবে দেখেছ তোমাকে এমন শুভ্রতায় দেখে আমার হৃদয়ে কতটা তোলপাড় হয়? তুমি আন্দাজ করতেও পারবে না আমার অনুভূতি সব।'
অহনা দু হাতে জড়িয়ে ধরে মাহতিমকে,' আমি বুঝতে পারছি, তুমি কথা ঘুরাচ্ছ। এসব বলে লাভ নেই। তুমি কি সত্যি আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে? আমি কিন্তু সব রেডি করে রেখেছি। একটু পর তুমি আমাকে নিয়ে যাবে। আমরা দূরে কোথাও চলে যাব। কেউ দেখতে পাবে না।'
' হুম আমার আহি, খুব দূরে চলে যাব। কেউ চাইলেও আর খুঁজে পাবে না। জানো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি!'
' আমি জানি। আর বলতে হবে না।'
' যদি কখনো ভুল বুঝো? তবুও বলব ভালোবাসি!'
' আমিও, ভীষণ ভালোবাসি!'
চলবে...
0 মন্তব্যসমূহ