#ছায়া_মানব 

#সাথী_ইসলাম 

৭৫.

অহনা কিছুটা বিরতি নিয়ে আড়ালে যায়। হাতে তার মেহেদী। মাহতিমের পাশে এসে দাঁড়ায়। দু হাতের মেহেদী দেখিয়ে বলল,' দেখো, কত সুন্দর লাগছে। এখন এই হাতে তোমার নাম লিখব। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে গেলে মেহেদী দেওয়ার সময় পাব না। তাই এখন দিয়ে নিই।'


মাহতিম নির্বিকার তাকিয়ে আছে অহনার দিকে। হাস্যোজ্জ্বল অহনার দীপ্তিমান হাসি দেখে সে নিজের মনকে থামিয়ে রাখতে পারল না। দেয়ালে আ'ঘাত করে। অহনা ঠোঁট উল্টে বলে,'‌ উমম! আমার হাতে তোমার নামটা তুমিই লিখে দাও।'


মাহতিম নাকোচ করে,

' আমি পারব না। তোমার হাতে আরিশের নাম লেখা উচিত ছিল।'


'‌ কি বলো এসব? তুমিতো দেখছি নিজের ব‌উকে অন্যের হাতে তুলে দিতে চাও।'


কথাটা শুনে মাহতিমের বুকটা ধ্বক করে উঠল। ঝাঁঝালো এক শব্দ কানে আসছে। বার বার কানে বাজছে,' সময় ফুরিয়ে এসেছে, হাতে বিন্দুমাত্র সময় নেই, কার্য হাসিল করো আর ফিরে যাও।' 


শব্দগুলোর প্রতিধ্বনিতে মাহতিমের শরীর বিষিয়ে উঠতে থাকে। কান চেপে ধরে। অহনা মাহতিমকে এমন করতে দেখে আস্তে করে ঘরে নিয়ে যায়। লোক সমাগম থেকে দূরে কিছুটা সুস্থ অনুভব করে সে। অহনার হাত দু'টো জড়িয়ে ধরে। ভীষণ হাঁসফাঁস লাগছে তার। দম আটকে আসছে। হারিয়ে ফেলার এক তীব্র ব্যথা অনুভব করছে। বুক আঁকড়ে ধরেছে না পাওয়ার উচ্ছ্বাস। মাহতিমের নাকের পাটা লাল হতে থাকে। শীতে কেমন জমে যাচ্ছে। অহনার হাত দুটো নিজের মুখের কাছে নিয়ে বলল,' আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো, আমি তোমাকে নিয়ে চলে যাব। খুব দূরে চলে যাব। খুব শান্তিতে থাকব আমরা দুজন।'


' ঠিক আছে, কিন্তু তুমি এখন বিশ্রাম নাও। শরীর খারাপ করছে তোমার। জ্বর এসেছে মনে হয়।'


এত কষ্টের মাঝেও মাহতিম হাসে,' পাগলি মেয়ে। আমি মানুষ ন‌ই যে জ্বর আসবে।'


অহনা কোনো কথা না শুনে মাহতিমকে খাটে শুইয়ে দেয়। লেপ মুড়ি দিয়ে থাকে মাহতিম। বাচ্চাদের মতো অহনার হাত আঁকড়ে ধরেছে। শীতে সে জমে যাচ্ছে। অহনা বুঝতে পারছে না কি করবে। উঠে যেতে চাইলেই মাহতিম বাঁধা দেয়,' উঁহু! যেও না তুমি। আমার কাছেই থাকো। তোমায় দেখলেই আমি সুস্থ হয়ে যাব।'


' আমি আছি, তোমার কাছেই আছি। কোথাও যাব না।' অহনা আলতো করে মাহতিমের কপালে চুমু খায়। পাশেই হাত ধরে বসে থাকে‌। একটু পর পর কপালে হাত দিয়ে দেখছে।


রুমি বলেছিল সে কখনো ওয়াইন খায়নি। তাই ওকে অভ্যাস করানোর জন্য মতি জোর করে খাইয়েছিল। কিন্তু বুঝতে পারেনি হিতে বিপরীত হতে পারে। রুমি নেশা সহ্য করতে পারেনি। রিয়্যাকশন বেশি হয়ে গেছে। মতি ওকে খাটে শুইয়ে দিয়ে ভাবতে থাকে কি করবে? বোধ বুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে। নিজের ঘরে নিয়ে আসলো রুমিকে। এখন যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে উল্টা পাল্টা ভাববে। দোষটা মতি নিজেকেই দেয়। সে যদি জোর করে না খাওয়াতো তাহলে এমনটা ঘটতো না কখনোই। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। 

দেখতে পায় টেবিলের নিচে বিয়ার রাখা। আরিশ তাকে খেতে না করে তাই লুকিয়ে খায়। এই মুহূর্তে এটা দেখে তার লোভ হয়। মাথাটাও ধরে আছে, তাই অনেকটা খেয়ে নেয়। শরীরের ভার ছেড়ে দেয় তার। নেশালো হয়ে যায়। চোখে মুখে তৃপ্তি লেগে থাকে। খেয়াল করল খাটের উপর রুমিকে। এপাশ ওপাশ করছে সে। মাথা তুলতে পারছে না। ভারী হয়ে গেছে খুব।

মতির লোভ হয় রুমির প্রতি। সোনালী লেহেঙ্গায় রুমিকে দেখে সে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। মেদহীন উদরের দিকে নজর যায় তার। উন্মুক্ত হয়ে আছে। আরো আকর্ষণ অনুভব করে সে। ক্রমশ এগিয়ে যায় রুমির দিকে। হঠাৎ তার বিবেক নড়ে ওঠে। কি করতে যাচ্ছে সে। নিজেকে গুটিয়ে নেয়। 

খাটের এক পাশে বসতেই তার চোখ আবারো রুমির দিকে স্থির হয়ে যায়। নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। বারবার তার উন্মুক্ত উদরের দিকে চোখ যাচ্ছে। অধরের স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করছে‌। নিজেকে সে একদম রুমির কাছে নিয়ে যায়। শরীরের ঘ্রাণ নিতে থাকে। এক পর্যায়ে নিজেকে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করে রুমির মাঝে। নেশালো রুমি নিজের অজান্তেই ভুল করে বসে। সাক্ষী শুধু নিভু নিভু ড্রিম লাইট।

আরিশ অনেকক্ষণ অহনাকে না দেখে উঠে আসে‌। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসে। বারান্দা পেরুতেই তার চাচা আলীমান ডেকে বলল,' আরিশ, মতিকে দেখছি না, কোথায় সে?'

' ঘরে আছে হয়তো। অনেকক্ষণ দেখিনি আমিও।'

' আমার একটু কাজ ছিল বাইরে যেতে হবে। ওকে দেখলে বলে দিস ফুলগুলো যেন ঠিক সময়ে নিয়ে আসে। আমার আর সময় হয়ে উঠছে না।'

আলীমান চলে যেতেই আরিশ অহনার কাছে না গিয়ে মতির ঘরের দিকে র‌ওনা দেয়। মতিকে তার কাজটা বুঝিয়ে দিয়েই না হয় অহনার সাথে দেখা করবে।

আদ্রিতা মেহেদী দিতেই ব্যস্ত ছিল। এমন সময় হুড়মুড় করে গায়ের উপর এসে পড়ল হ্যারি। সমস্ত মেহেদী তার গালে লেপ্টে গেল। আদ্রিতা পুরো গায়ের শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠে। হকচকিয়ে উঠে হ্যারি। 

ফুলের গোছা হাতে নিয়ে সে আসছিল। কোন কুক্ষণে পা আটকে পড়ে গেল। পড়ল তো পড়ল, আর কোনো জায়গা না পেয়ে একদম আদ্রিতার কোলে। 

রাগে গজগজ করতে থাকে আদ্রিতা। হ্যারি কেটে পড়ার ধান্ধা করছে। এবারের মত বেঁচে যাওয়ার ফরিয়াদ করছে আল্লাহর কাছে,' ওহ আল্লাহ্! এবারের মত বাঁচিয়ে দাও, আর কখনো এমন শাক'চুন্নীর মুখোমুখি হব না‌।'

আদ্রিতা রেগেমেগে দুহাতের সব মেহেদী আরেক দফা হ্যারির গালে লেপে দেয়,' নষ্ট করেছ না আমার মেহেদী মাখা হাতটা। এবার দেখো কেমন লাগে! তোমার মুখ‌ও রঙিন করে দিলাম।'

বলেই ঠোঁট বাঁকা করে চলে গেল আদ্রিতা। সবাই হ্যারিকে দেখে হাসছে। ভুল করে হলেও কেমন সবার হাসির পাত্র হয়ে গেল। মুখটা জ্বলছে খুব। মুখে কখনো মেহেদী শ্যুট করে না। 

হ্যারি থমথমে মুখে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। অপমানে তার শরীর রি রি করে। চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তৎক্ষণাৎ মনে হলো অহনা রাগ করবে তার উপর। তাই এই সিদ্ধান্ত বদলালো। কিন্তু এই আদ্রিতার থেকে দূরে থাকবে বলে ঠিক করল।

আরিশ মতির ঘরে যেতেই অবাক হয়ে যায়। আচমকা এমন কিছু দেখবে সে ভাবতে পারেনি। চোখ লাল হয়ে আসে তার‌। তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়িয়ে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে ধমকের সুরে মতিকে ডাক দেয়,' এসব কি হচ্ছে এখানে?'

হকচকিয়ে উঠে মতি। নিজেকে কাপড়ে মুড়িয়ে সাথে সাথে লাফিয়ে আসে আরিশের দিকে। কথা বন্ধ হয়ে গেছে‌ তার। কি বলে কি বোঝাবে বুঝতে পারছে না।

আরিশ কষে একটা থা'প্পর বসিয়ে দেয় মতির গালে। চার আঙুল বসে যায় তার শক্তপোক্ত গালে।

' ভাই, তুমি আমাকে মারলে?'

' তোকে তো আমি..'

আরিশ কলার চেপে ধরে মতির,' কি করছিলি তুই? আমার মাথা ঘুরছে, এসব কি... আমি কিছু ভাবছে পারছি না।'

' ভাই, আমার কথাটা শুনো একবার। আমি সবটা বুঝিয়ে বলছি।'

আরিশ পুনরায় থা'প্পর মারে মতিকে,' আমাকে এখন কি বুঝাবি তুই? অহনা এসব জানতে পারলে কি করবে ভেবে দেখেছিস?'

রুমির জ্ঞান ফিরে আসে। নিজেকে অন্য এক অবস্থায় আবিষ্কার করে চিৎকার করে উঠে। কোনোমতে সামলে নেয়। আরিশ ওর কাছে গিয়ে বলল,' তুমি শান্ত হ‌‌ও, আমি দেখছি বিষয়টা। দয়া করে শান্ত হ‌‌ও।'

মতি কিছু বলার আগেই আরিশ বলল,' তোকে পুলিশে দেব। আর সুযোগ দেব না। আজ যে অন্যায় করেছিস সেটা সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধ।'

মতি আরিশের পা জড়িয়ে ধরে,' না ভাই, এটা করো না। আমি সজ্ঞানে কিছু করিনি। এতে না আমার সম্পূর্ণ দোষ আছে না রুমির।'

' দোষ নেই তোর? ওকে এই ঘরে এনেছে কে?'

' বাইরে ও অজ্ঞান হয়ে গিয়েছি তাই আমি নিজের ঘরে নিয়ে এসেছিলাম ওকে।'

' ঘরে এনেই তার অসহায়তার সুযোগ নিলি? তুই একটা অমানুষ, কখনো মানুষ হবি না। এমন অমানুষের একটাই শাস্তি, জেলে পচে মরবি, আমি আর দয়া করব না।'

মতি কান্না করে দেয়,' আমি ওকে ভালোবাসি ভাই, আমি বুঝতে পারিনি, কি থেকে কি হয়ে গেল।'

আরিশ আরেক দফা অবাকের পর্যায়ে পৌঁছে। রুমি নিজেকে আর সামলে রাখতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগের কথা মনে হতেই হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে। কত‌বড় ভুলটাই না করে বসল। আর কিছু ভাবতে পারছে না, অসহায়ের মত কান্না করছে।

আরিশ মতিকে বলল,' নিজেকে বাঁচাতে এবার মিথ্যে বলছিস? এবার মেয়েটার ইমোশন নিয়েই খেলার ইচ্ছে হলো নাকি।'

' না ভাই, তুমি ওকে জিজ্ঞেস করো। ও নিশ্চয় আমাকে ভালোবাসে। যা হয়েছে ভুল করেছি, আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।'

' ও কি তোকে বিয়ে করতে চাইবে?'

আরিশ রুমির কাছে যায়,' মতি যা বলছে সত্যি? তোমরা একে অপরকে পছন্দ করো?'

রুমি একবার আরিশের দিকে তাকায় আরেকবার মতির দিকে। মতি অসহায়ের মত তাকিয়ে আছে রুমির দিকে। রুমির একটা উত্তর‌ই সব ঠিক করে দেবে। যদি তারা একে অপরকে আগে থেকেই পছন্দ করে থাকে তাহলে এই ভুলটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারা যদি একে অপরকে মেনে নেয় তাহলে সামান্য ভুলটা আর গাঢ় হবে না। 

রুমি কিছু বলার আগেই দরজায় মোড়লকে দেখতে পায়। মোড়ল মতির সাথে কথা বলতে এসেছিল। এসেই আরিশ আর মতির সব কথোপকথন শুনে নিল। 

মোড়ল লোকটা একদম ঠান্ডা মস্তিষ্কের। ঠান্ডা মাথায় সব সমাধান করতে পছন্দ করেন তিনি। কখনো তাকে উত্তেজিত হতে দেখা যায়নি। এখনো তিনি সুস্থ মস্তিষ্কে থেকে ঘরের ভেতর কদম ফেলেন। মতির হৃদ কাঁপতে থাকে। আরিশকে সে যতটা না ভয় পায় মোড়লকে আরো বেশি পায়। 

মোড়ল এগিয়ে এসেই আরিশকে বলল,' ওকে বলে দে, আজকের পর যেন এই বাড়ির ত্রিসীমানায় না দেখি। এমন কুলা'ঙ্গার ছেলে আমার চাই না।'

চলবে....