#ছায়া_মানব

#সাথী_ইসলাম 

৭৩.

বাড়ি ভর্তি মেহমান। এক দন্ড ফাঁক নেই কোনো কিনারায়। হ্যারি এসেই এদিন ওদিক দেখছে। মনটা বিষন্ন তাও সে ঠোঁটের কোনে হাসি রেখে অহনার কাছে আসে। ড্রেককে পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে হঠাৎ সে পৃথিবী থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছে। পুলিশরাও কোনো কিনারা করতে পারল না‌। অর্থাৎ ড্রেক নামের কাউকে তারা শনাক্ত করতেই পারছে না, খুঁজে পাওয়া অনেক দূরের কথা। এর‌ই মাঝে টিকুর এক্সি'ডেন্ট তাকে ভেতর থেকে আরো ভেঙে দিল। প্রিয় দুই বন্ধুকেই হারালো। চোখের কার্নিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি হয়ে নিজেকে সামলে নেয়। একজনকে জিজ্ঞেস করল,' ভাই, ব‌উয়ের ঘর কোন দিকে?'

সে ছিল আরিশের মামাতো ভাই রাতুল। রাতুল ইশারা করে দেখিয়ে দিল অহনার ঘর। হ্যারি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে অহনার সাথে দেখা করতে যায়। কিন্তু দেখল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। 

ভেতরে মহিলারা অহনাকে মেহেদী অনুষ্ঠানের জন্য সাজাচ্ছে। হলুদ শাড়ি পরানো হয়েছে ওকে। ফুলের কানের দুল, টিকলি, চুড়ি, গলার হার সবকিছু। মনে হচ্ছে ফুলে ফুলে আজ ফুলপরীতে পরিণত হয়েছে অহনা। এসবে তার কোনো আগ্রহ নেই। ঘরের কোণায় রাখা ফুলদানিটার দিকে তাকিয়ে আছে প্রথম থেকেই। মহিলারা হাজার রংয়ের কথা বলছে, সেদিকে কান নেই অহনার। একজন বলল,' এত রূপবতী দেখেছি বলে মনে হয় না কখনো। কিগো আরিশের মা, কোথা থেকে আনলে এই হিরেকে?'

আয়শা এক গাল হেসে বলল,' আমাদের গ্রামের মেয়েই, শহরে ছিল ছোট থেকে, তাই দেখনি। আমার আরিশের সাথে কেমন মানাবে গো?'

কয়েকজনের গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। অহনাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে, যদি কোনো খুঁত পেয়ে যায়, তাহলে আরিশের মায়ের বড় বড় কথা বের করে নেবে। কিন্তু নিখুঁত অহনার কোনো খুঁত তারা পেল না। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল একজন,' দেখো বোন, সুন্দরী বলে আদরে গাছে তুলো না যেন, পরে নামাতে পারবে না বলে দিলাম। এখনকার মেয়েরাতো জামাইকে আঁচলে বেঁধে রাখতে চায়। দেখো, তোমার ছেলেটা আবার যেন ব‌উয়ের রুপে পাগল হয়ে তোমাদের ভুলে যায়। এসবতো অহরহ ঘটছে। আমি বাপু তোমার ভালো চাই, তাই সাবধান করলাম।'

' যদি নিজের জামাইকে আঁচলে বাঁধতে চায়, তাহলে বাঁধুক, তাতে আমার কি? ছেলেকে বিয়ের পর ব‌উয়ের হাতে তুলে দিয়েই আমি মুক্ত। ব‌উ এবার যাই করুক তার সাথে। আমার শিক্ষা যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সে ভালোটাই করবে। আমার বিশ্বাস আছে আমার ছেলে এবং ছেলের হবু ব‌উয়ের উপর। তোমাদের এত চিন্তা করতে হবে না।'

তন্দ্রা সুর মিলিয়ে বলল,' হ, আপা। ঠিক বলেছ। এমন চাঁদমুখের মেয়েকে তো আমিই চোখের আড়াল করতে চাইব না। আরিশ কি দোষ করল তাহলে?'

উপস্থিত সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠে। মায়াবী অহনার মায়াবী নজর সবাইকে মুগ্ধ করছে। আয়শা এসেই চোখের কাজল লাগিয়ে দিয়ে বলে,' নজর না লাগুক। এই উজ্জ্বলতা দিয়ে আমার পুরো বাড়িটাকে উজ্জ্বল করে রেখো।'

তন্দ্রা বলল,' বিয়ের পরপরই কি তাকে সংসারের চাবি দিয়ে দেবে নাকি?'

' চুপ কর ছোট! এখন এসব কথা নয়। সেটা পরে দেখা যাবে। বড় ব‌উ হয়েছে যেহেতু তাকেই সব সামলাতে হবে। কিন্তু এখন এসব কথা না।'

আয়শা অহনার কপালে চুমু খেয়ে চলে যায়। একে একে সবাই বেরিয়ে যায়। শুধু রুমি আর আরিশের একটা ছোট চাচাতো বোন থাকে।

মাহতিম এতক্ষণ আরিশের ঘরে ছিল। তারা কিছু আলোচনা করেছে। মাহতিম বেরিয়ে এসে অহনার কাছে যায়। অহনা পেছন ফিরে বসে ছিল, তাই তেমনটা দেখতে পায়নি। মাহতিম অহনা বলে ডাক দিতেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে অহনা পেছনে তাকায়। মাহতিমের হৃদয়টা যেন কিছু সময়ের জন্য থমকে যায়। স্পন্দন থেমে যায়। ভুবনমোহিনী সুন্দরী রমনী এখন তার চোখের সামনে। চোখ ফেরাতে পারছে না সে। এতোটাই গভীর অহনার চোখ, মনে হলো কোনো মায়া হরিণী তার দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে আছে মাহতিমের সম্মুখে। বুকের ভেতরটা চিনচিন করছে। অহনা রুমি আর তিন্নিকে বলল,' তোমরা একটু বাইরে যাও, আমি একটু একা থাকব। একটু পর আবার এসো।'

ওরা ঘরে থেকে চলে যেতেই অহনা দরজা বন্ধ করে দেয়। দৌড়ে মাহতিমের কাছে আসে। মাহতিম এখনো হা হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক পড়ছেনা তার। সবকিছু গুলিয়ে গেছে তার। অহনা ওর চোখ চেপে ধরে বলল,' এবার দেখি কি করছ দেখো, আর কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থেকে কাটাবে?'

মাহতিম অহনার হাত সরিয়ে দিয়ে নিজেকে আরও কিছুটা সামনে নেয় অহনার, এত সৌন্দর্য কেন তোমার? বার বার কেন মুগ্ধ হ‌ই আমি? এটা কি ব্যাধি নাকি আমাকে ঝলসে দেওয়ার অন্য কোনো মন্ত্র?'

অহনা হেসে ফেলে,' এসব কি বলছ? মাথা ঠিক আছে?'

মাহতিম অহনার ঠোঁট স্পর্শ করে বাহু দ্বারা। কিছুটা লাল লিপস্টিক তার হাতে লেগে যায়। কাজলের আঁকা চোখগুলো স্পর্শ করে দেয়,' জাদু কি জানো?'

অহনা বিস্ময়ে হতবাক,' উঁহু!'

তোমার মায়াময় দুটি চোখ। যার মায়ায় আমি বার বার পড়ি।'

অহনা কোমরে হাত দিয়ে বলে,' তুমি কি চাও বিয়েটা হয়ে যাক? দেখো, আমি এত অভিনয় করতে পারব না। তুমি তাড়াতাড়ি কিছু করো।'

' করবতো, সব করব!'

' কবে করবে? তুমি কি আরিশের সাথে কথা বলেছ? সে কি বলেছে? আমি জানি এটা অন্যায়, খারাপ কাজ, বিরোধী এটা। কিন্তু তোমাকে আমি চাই, এইটুকু রিস্ক আমি নিতে চাই। তারপর সব ঠিক হবে যাবে।'

' হ্যাঁ, আমি করা বলেছি আরিশের সাথে।'

' কখন কি করবে আমাকে বলো?'

' কিছুই করতে হবে না। একটু অপেক্ষা করো, তারপর সব বুঝতে পারবে।'

অহনা মাহতিমকে জড়িয়ে ধরে,' আমি সবসময় চাই তোমাকে। ভালোবাসি খুব বেশি।'

' আমিও।'

হঠাৎ কেঁদে উঠে মাহতিম। বুকটা কেন জানি হুঁ হুঁ করে উঠল। বুক চিঁড়ে আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইছে। অহনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। পরম যত্নে একজন অন্যজনের নিঃশ্বাসের গভীরতা শুনতে থাকে। 

মাহতিম অহনার কপালে চুমু এঁকে দেয়,' তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে আজ।'

' তোমাকেও, সবসময় সুদর্শন লাগে আমার।'

' ছিন্নভিন্ন হৃদয়টা শেষ পর্যন্ত তোমাকেই চাইবে দেখে নিও।'

হ্যারি বাইরে পায়চারি করছিল। রুমি বলেছে কিছুক্ষণ পর ঢুকতে, এখন বিরক্ত না করতে। তাই সে যায়নি। অনেকটা সময় অপেক্ষা করেছে। তাই অহনার ঘরের দিকে র‌ওনা দেয়। 

হঠাৎ হাঁটার মাঝখানে পা পিছলে গিয়ে একটি মেয়ের উপর পড়ে। তার হাত থেকে সব মেকআপ ইন্সট্রুমেন্ট পড়ে যায়,

' ওমাগো, মরে গেলাম গো, আস্ত একটা হাতি আমাকে থেঁতো করে দিল। ষাঁড়ের বা'চ্চা উঠতে বলছি।'

হ্যারি না উঠেই তাকিয়ে থাকে সামলে থাকা রমণীর দিকে।

আবার চিৎকার করে উঠে,' জল'হস্তি কোথাকার আমাকে মেরে ফেলল।'

হ্যারি এবার নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পড়ে। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,' তোমার লাগেনিতো পিচ্চি?'

' তোমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরোটা পিচ্চি। এই আদ্রিতাকে পিচ্চি বলতে আসো, কতবড় সাহস তোমার।'

'স্যরি, নামটা জানা ছিল না‌, তাই বললাম। কিন্তু তুমি এত ঝগড়ুটে কেন? এত প্যাচপ্যাচ করে কথা বলো কেন? এটাই কি তোমার স্বভাব?'

' তুমি খচ্চ'র চিনো?'

'হুম চিনি। তা দিয়ে তোমার কাজ কি?'

' ঐ খচ্চ'রের মতো চলাফেরা তোমার। দিলেতো আমার সব মেকআপ ইন্সট্রুমেন্ট খারাপ করে। তোমার জন্য অনেকগুলো প্রোডাক্ট নষ্ট হলো।'

' সে কখন থেকেই আমার সাথে যা নয় তাই ব্যবহার করে যাচ্ছ। তোমার জন্মের সময় মনে হয় এদেশে মধু ছিল না। তোমার মা তোমার মুখে মধু দিতে পারেনি। তাই এমন তেতো কথা বের হয় মুখ দিয়ে।'

আদ্রিতা আঙুল উঁচিয়ে বলল,' মুখ সামলে কথা বলো। এটা তোমার বাড়ি নয়।'

হ্যারি আদ্রিতার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,' এই বাড়িটা আমার না হলেও তুমি যে এই বাড়ির কাজের লোক সেটা ভালো করেই বোঝা যাচ্ছে। আমার সাথে লাগতে এসো না।'

' আমি তোমার সাথে লাগছি না। তুমিই আমার সাথে লাগছ। প্রথমেই আমার ড্রেস আর মেকআপ খারাপ করলে। এখন মুখে মুখে তর্ক করছ। কি ঝগড়ুটে ছেলে তুমি।'

হ্যারি আদ্রিতার মুখ চেপে ধরে। কিছুটা দূরে নিয়ে বলল,' এবার যা ইচ্ছা বলো। আমি কান খুলে শুনি। ওখানের মানুষজন যেভাবে দেখছিল, আর একটু হলে আমাকে কাটা চামচ দিয়ে কষিয়ে খেতো। কিন্তু তোমার সমস্যা কি?'

আদ্রিতা চুপ করে যায়, একটা কথা মনে পড়ে। একটু আগেই আয়শা বলেছিল কারো সাথে ঝগড়া না করতে। একটু পান থেকে চুন খসলেই সে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। তাই পুরো সময় চুপ থাকতে বলেছিল। কিন্তু ভুলে গিয়েছে। এখন চুপ, আর কোনো কথা বলবে না। সোজা চলে যেতে চাইলে হ্যারি সামলে বিয়ে দাঁড়ায়,' তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছ? একটু আগেতো বাঘিনীর মতো কথা বলছিলে। এখন সব উড়ে গেল।'

' মা বলেছে ঝগড়া না করতে‌। তাই কিছু বলছি না। না হয় আমার থেকে রেহাই পেতে না।'

' ওহ আচ্ছা। কিন্তু এটা বলো, তুমি কে? বরের কি হ‌ও?'

' আমার ভাইয়ার বিয়ে আজকে পুতুল ভাবীর সাথে।'

' পুতুল কে? ওর নামতো অহনা।'

' আমি আদর করে পুতুল ভাবী ডাকি। তোমাকে এর কৈফিয়ত দেব না।'

' দিয়ে দিয়েছ অলরেডি। আর দিতে হবে না।'

' বেশি কথা বলো। আমি গেলাম।'

' আশা করি আবার দেখা হবে। আরেকবার ধাক্কা খেলে এবার তুমি আমার গায়ে পড়ো, সমস্যা নেই।'

' যার রুচি যেমন, সে তেমনি ভাবে। পাশে ওয়াশরুম আছে গিয়ে নিজের রুচি ধুয়ে আসুন।'

আদ্রিতার্ ভেঙচি কেটে চলে যায়। হ্যারি পেছন থেকে তাকিয়ে থেকে বলল,' পেয়ে গেলাম আমি। এবার জমবে মজা। ইয়েস!'

হ্যারি উল্টো দিকে ফিরতেই আরিশের চোখাচোখি হয়। আরিশের চোখ বড় বড়। চোখে থেকে যেন আগুন ঝড়ে পড়ছে।


চলবে....