#ছায়া_মানব
#সাথী_ইসলাম
৭৪.
আরিশ হ্যারির সামনে এসেই দাঁত কপাটি এক করে বলল,' একটু আগে তুমি কি বলেছিলে?'
হ্যারি থমথম খেয়ে যায়। সে মজার চলেই বলে ফেলেছে, এতে কোনো সমস্যা হবে বলে তার জানা ছিল না। কোনোরকমে বলল,' জীজু, আমিতো মজা করছিলাম। আপনি সিরিয়াসলি নেবেন না। এটা একটা এক্সি'ডেন্ট ছিল। তাই মজার চলেই বলেছি।'
এরই মাঝে আরিশের মামাতো ভাই এসে তাকে নিয়ে চলে যায়। হ্যারি বুকে থু থু দিয়ে বলে,' বাব্বাহ! জোর বাঁচা বেঁচে গেছি।'
হ্যারি অহনার সাথে দেখা করতে যায়। কথা বলার মাঝখানেই আদ্রিতা এবং লাবণী আসে। হ্যারিকে অহনার কাছে দেখে আদ্রিতার রাগ বেড়ে যায়। তেড়ে এসে বলে,' তুমি এখানে কি করছ, তোমাকে কে বলেছে পুতুল ভাবীর কাছে আসতে? তুমি আবার কিছু চুরি করতে আসনিতো?'
হ্যারি আদ্রিতাকে মুগ্ধ হয়ে দেখছে। সাজার পর তার সৌন্দর্য কয়েক গুন বেড়ে গেছে। হ্যারি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে থুতনিতে হাত বুলিয়ে বলল,' ছেহ, কি ময়দা মেখে এসেছ। আজকে যদি কোনো শাক'চুন্নী তোমাকে দেখে তাহলে নিজের চেহারাই ভুলে যাবে। কেমন উদ্ভট লাগছে তোমাকে। এসব ধুয়ে আসো, না হয় সবাই ভূত ভেবে তোমার জন্য ওঝা ডেকে আনবে।'
আদ্রিতা তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়িয়ে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে হ্যারির গলা চেপে ধরে,
' আমাকে ভূতের মত লাগছে তাই না? তোমাকে মনে হয় রাজকুমার লাগছে? পুরো টিকটিকির মত লাগছে তোমাকে। নিজেকে একবার আয়নায় দেখো।'
অহনা শাসিত কন্ঠে বলে,' এবার থেমে যাও তোমরা। এভাবে ঝগড়া করলে কখনো সমস্যা সমাধান করা যায় না।'
হ্যারি আর আদ্রিতা থামতে নারাজ। এবার তারা অহনাকে একে একে বিচার দিচ্ছে। দুজনেই নিজের কথায় অটুট। তাদের ভাষ্যমতে অপরাধী অপরপক্ষ। অহনা বলল, ভাব করে নিতে। তারা অনিচ্ছুক। এটা নিয়েও ঝগড়া বাঁধিয়ে দিল।
লাবণী অহনাকে বলল,' তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।'
অহনা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,' আমি জানি। এটাই বলবে তো, আমি যেন আরিশকে বুঝাই?'
' আমি কি করব বলো? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি কখনোই আরিশের সাথে তোমাকে মেনে নিতে পারব না।'
'ভয় পেয়ো না। কালকে দেখবে কি হয়! জাস্ট ওয়েট এন্ড সি! দেখবে সব ঠিক তোমার মনের মত হয়েছে। তবে পরিবারের সবাই একটু কষ্ট পাবে। কিন্তু কয়দিন পর ঠিক হয়ে যাবে।'
' কি করবে তুমি?'
' আমি বলেছিলাম না, আমার বয়ফ্রেন্ড আছে, সে কালকে আমাকে বিয়ের আসর থেকে তুলে নিয়ে যাবে। আর সে সময় সবাই উপায় না পেয়ে তোমার সাথেই বিয়েটা দিতে চাইবে?'
' তুমি এত সিউর কি করে, আমার সাথেই সবাই বিয়ে দিতে চাইবে?'
' আচ্ছা, বুঝোনি তাই না? আমি বুঝিয়ে বলছি, তোমাদের মধ্যে তো তুমি ছাড়া আর কোনো বোন নেই তাই না? যাকে তাকে অন্তত তারা বিপদের সময় আরিশের জন্য বেছে নেবে না। একমাত্র অপশন তখন তুমি থাকবে। সবাই তখন তোমাকেই বিয়ের জন্য জোর করবে। তখন তুমি প্রথম একটু নাকোচ করে পরে রাজি হয়ে যাবে। সাথে সাথে রাজি হলে আবার সবাই অন্যকিছু ভাবতে পারে।'
' এটা ভালো আইডিয়া। তবে আমার ভয় হচ্ছে, যদি সব প্ল্যান মত না হয়?'
', আশা করি এমনটা হবে না। আমার মাহতিমের প্রতি বিশ্বাস আছে। সে আমার জন্য সব করতে পারবে। এটাও সম্ভব করে দেখাবে।'
' ওহ আচ্ছা, তার মানে তোমার বয়ফ্রেন্ডের নাম মাহতিম?'
' হু!'
' আমি তাকে দেখতে চাই। কে সেই ব্যক্তি, যে তোমাকে পেয়ে যাবে?'
অহনা আদ্রিতা আর হ্যারিকে লক্ষ্য করল। দেখল তারা এখনো ঝগড়া করতেই ব্যস্ত। তাই সে ছবির এলবামটা এনে দেখালো লাবণীকে। লাবণী উচ্ছাসিত হয়ে বলল,' ওয়াও, তোমাদের জুটি অনেক সুন্দর। আশা করি পূর্ণতা পাবে।'
অহনা হ্যারির কাছে যায়। অনেক কষ্ট করে তাদের ঝগড়া থামায়। দুজনেই হাঁফিয়ে গেছেন ঝগড়া করে। আর একটু হলে একজন খু'ন হয়ে যেত। বাইরে থেকে সবাই আদ্রিতা, লাবণীকে বলছে অহনাকে নিয়ে যেতে।
অহনা সবাইকে বলল,' আমার একটু কাজ আছে। তোমরা বাইরে যাও, দুই মিনিটের মধ্যে আমি বাইরে যাব।'
সবাই বেরিয়ে যেতেই অহনা মাহতিমকে বলল,' তুমি কি অনুষ্ঠানে থাকবে?'
' আমার যাওয়া ঠিক হবে না। আশা করি আরিশের সাথে আজকের মুহুর্তটা অনেকটা ভালো কাটবে তোমার।'
' এসব কি বলছ? আমাকে রাগিয়ে দেবে না।' অহনা আরেকবার জড়িয়ে ধরল মাহতিমকে।
' তোমায় ছাড়া আর কারো কথা চিন্তা করলেও যেন আমার দম আটকে আসে। তোমার সাথেই আমার সব মুহুর্ত ভালো কাটে। আমরা যখন এখান থেকে চলে যাব। তখন সমুদ্রের পাড়ে একটা বাড়ি করব। আমাদের দুজনের ঐ ছোট্ট বাড়িতে বিয়ে হবে। বরপক্ষ, কনেপক্ষে মানুষ থাকবে কিনা জানি না। তবে সমুদ্রের শুভ্র আভা, নীলাকাশ, সমস্ত সমীরণ, পাখপাখালি, থাকবে অগণিত। তারা আমাদের সঙ্গী হবে নতুন জীবনের। আর একটা কথা, আমি কিন্তু সাদাময় সবকিছুতেই বিয়ে করব। আমাদের বেড হতে পোশাক পর্যন্ত সব সাদাময় হবে। তারপর কত সময় কেটে যাবে, একে অপরের ছায়া হয়ে থাকব সুখে দুঃখে। আমাদের অনেকগুলো বাচ্চা হবে। তাদের নিয়ে সময়টা আরো মুখরিত হবে। তখন আমি আর তুমি....'
মাহতিম অহনাকে থামিয়ে দেয়,' এত স্বপ্ন যদি সত্যি না হয়, কষ্ট পাবে?'
' উঁহু! এমন কথা বলোনা। আমি সহ্য করতে পারব না সেটা।'
মাহতিমের চোখ লাল হয়ে আছে। কান্না পাচ্ছে তার। নিজেকে সামলে নিয়ে একখানা চিরকুট দিল অহনাকে। অহনা হাতে নিয়েই সেটা খুলতে চাইলে মাহতিম বাঁধা দিয়ে বলে,' উঁহু! এখন না। এটা তুমি অবসরে খুলবে। কাল দেখো এই লেখা।'
' কি আছে এটায়?'
' তখনই না হয় দেখো। এখন খুলোনা।'
অহনার মাহতিমকে ছেড়ে দেয়। হাতে হাত রেখে আরেকবার আলিঙ্গন করে চলে যায়।
আরিশ হলুদ পাঞ্জাবী পরেছে। লাবণী এক দৃষ্টিতে হা হয়ে তাকিয়ে আছে। সে নিজেকে কল্পনায় নিয়ে গিয়েছে। যেখানে সে আর আরিশ একসাথে বসে আছে। তাদের হলুদের পর্ব চলছে। কত খুশি লাবণী। সবাই তাদের হলুদ ছোঁয়াচ্ছে। লাবণী এক্সাইটমেন্ট ধরে রাখতে না পেরে আরিশকে কাছে টেনে নেয়। মৃদু স্বরে বলল,' আমার সবচেয়ে প্রিয় তুমি। পেয়ে গেলাম খুব সহজে।'
বলেই তার ঠোঁটে আকৃষ্ট হয়ে চুমু খেতে গেলেই আদ্রিতা নিজের মুখে হাত দিয়ে নেয়,' কি করছ আপু? তুমি কি এখন আমাকে চুমু খাবে নাকি?'
লাবণী আরিশের জায়গায় আদ্রিতাকে দেখে দূরে সরে যায়। কিছুটা দূরে তাকায়ে দেখে আরিশ সবার সাথে কুশল বিনিময় করছে।
লাবণী লজ্জা পেয়ে যায়। আরিশ ভেবে একটু আগে আদ্রিতাকে চুমু খেতে যাচ্ছিল। নিজের মাথায় নিজের চাপড় দেয়। আদ্রিতা ওকে সূক্ষ নজরে পরখ করে বলল,' কি হয়েছে তোমার? তুমি কি আমাকে ভাইয়া ভেবেছিলে নাকি?'
' না মানে! দেখ পেছনে হ্যারি দাঁড়িয়ে আছে।'
এটা বলেই লাবণী চলে যায়। আদ্রিতা তার পেছনে কাউকেই দেখতে পেল না।
অহনা আরিশকে একসাথে বসানো হয়। দুপাশে দুজন মেয়ে মেহেদী লাগিয়ে দেবে। আরিশ অনেক খুশি। সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। তার ভেতর চিন্তার ছিটে ফোঁটাও নেই। সে অনেক উপভোগ করছে পুরো সময়টা। যদিও চোখ জোড়া স্থির রয়েছে অহনার দিকে। কয়েকজন এসে মজা নিয়ে গেল। আরিশের এমন তাকিয়ে থাকা দেখে অহনা ঢোক গিলে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,' এটা সত্যি না। আপনি এত কি দেখছেন?'
' তোমাকে!... না মানে, তোমার শাড়িটা।'
অহনা নিজেকে দেখে,' কোথায় কি? আমার শাড়ি একদম ঠিক আছে।'
আরিশ লজ্জা পেয়ে যায়। কি বলতে কি বলে ফেলেছে। সেতো আর বলতে পারছে না যে, সে অহনাকে দেখছে। অহনা আর কিছু না বলে মেহেদীর দিকে মনোযোগ দেয়।আরিশের বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটা শুরু হয়েছে। অহনা ঠিক তার সাথে বসে আছে হলুদে আবৃত হয়ে। এমন দৃশ্য যে পুরুষ দেখেছে, সেই জানে সময়টা কতটা মোহনীয়।
অহনা পাশেই মাহতিমকে দেখতে পায়। এটা নিঃশ্বাসেই যেন দেখে শেষ করে দেবে। চোখ ছলছল করছে মাহতিমের। নিজের ভালোবাসাকে অন্যের সাথে দেখছে সে। একটু পর অহনার রাঙা হাতকে আরো রাঙানো হবে। সেই রাঙা হাতে থাকবে আরিশের নাম।
অহনা ছটফট করছে উঠে যেতে। কিন্তু পারছে না। নিয়মগুলো তাকে মানতেই হবে। এখন বাঁধা দিলে সমস্যা হবে।
আরিশের হাতে অহনার নাম লেখা হলো। আদ্রিতা এসে বলল,' আমার মনে হয় ভাইয়া আর পুতুল ভাবীর হাতে একই মেহেদী লাগানো উচিত, কম্বিনেশন করে।'
আদ্রিতা দুজনের হাত কাছাকাছি এনে বলল,' তোমরা একে অপরের হাত ধরে, একসাথে মেহেদীর ডিজাইন থাকলে সুন্দর দেখা যাবে।'
আরিশ দেখল অহনার মুখ গোমরা। সে চায় না এটা করতে। আরিশ অহনার মনের অবস্থা বুঝতে পারে। তাই বলল,' আমি কম্বিনেশন পছন্দ করি না। তাই আলাদা দেওয়াটাই ব্যাটার হবে।'
' কিন্তু ভাইয়া...'
' আর কোনো কিন্তু না। আমি যা বলছি তাই শেষ কথা।'
আদ্রিতা রেগেমেগে চলে যায়। একটা বুদ্ধি দিল, সেটাও আরিশ কানে নিল না। অহনা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলে।
আরিশের হাতে অহনার নাম লেখা হলো। কিন্তু অহনার হাতে লিখতে গেলেই সে বাঁধা দিয়ে বলল,' নাম লিখলে ডিজাইন খারাপ হয়। তাই লিখতে হবে না।'
মেয়েটি অহনার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,' না আপু! বিয়েতে কনের হাতে বরের নাম লিখতে হয়। তবে সেটা আপনার ইচ্ছা।'
অহনা বুদ্ধি করে বলল,' আমার বরের নাম আমি নিজে লিখব, তুমি জায়গা খালি রাখো।'
রুমিকে মতি জোর করে অনেকটা ওয়াইন খাইয়ে দিল। বেচারি শরবত ভেবে খেয়ে নিল। ওদের সময়টা খুব মিষ্টি ছিল। এক পর্যায়ে রুমি চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করে। অবস্থা বেহাল দেখে মতি ওকে ঘরে নিয়ে যায়।
চলবে....

0 মন্তব্যসমূহ