#ছায়া_মানব

৭২ তম পর্ব 

৭২.
অনেকটা সময় গড়িয়ে গেছে। স্নিগ্ধ নদীর পাড়ে দুজন কপোত কপোতী সুখ নিচ্ছে। তাদের মনে কষ্টের ছিটে ফোঁটাও নেই।
মাহতিম অনেকক্ষণ পর বলল,' আমাদের এখন বাড়ি যাওয়া উচিত।'
অহনা অনিচ্ছায় মাথা নাড়ায়। মাহতিমের বুকে পরম শান্তিতে চোখ বুঁজে আছে। মাহতিম পুনরায় তাড়া দিতেই অহনা বিরক্তিতে তার মুখ চেপে ধরে,' চুপ করে থাকো তো। এখন বাড়ি গিয়ে কি করব? এর থেকে ভালো হবে যদি আজ রাতটা এখানেই কাটিয়ে দিই। একদম কথা বলবে না।'
মাহতিম অহনাকে কোলে তুলে নেয়,' এবার দেখি কিভাবে এখানে থাকো। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সবাই খুঁজবে তোমাকে। মাথায় যদি একটু বুদ্ধি থাকতো তাহলে এমনটা করতে না।'
' আমি এতটা বাধ্যবাধকতায় থাকতে পারিনা। তুমি আমাকে নামিয়ে দাও। বাড়িটার থেকেও এখানে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে।'
মাহতিম কোনো কথা শুনে না পাঁজাকোলে করে অহনাকে বাড়ির উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়।
মোড়ল এখনো বসে আছে। অহনার কান্ডে সে অনেকটাই কষ্ট পেয়েছে।
অহনা ওড়ঁনা বেয়ে উপরে উঠে আসে। চোখের সামনে মোড়লকে দেখতে পেয়ে কলিজা কেঁপে উঠে। মোড়ল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। অহনার কাছে আসতেই আরেক দফা হৃদ কেঁপে উঠে অহনার। কোথায় ছিল এতক্ষণ, এই প্রশ্ন করলে কি উত্তর দেবে সেটা ভেবে চলেছে। মস্তিষ্ক একদম ফাঁকা। কোনো আইডিয়া মাথায় আসছে না।
মোড়ল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জানতে চায়,' কোথায় গিয়েছিলে?'
অহনা কি বলবে বুঝতে পারে না। এত রাতে বাইরে ছিল, সেটা কোনোমতেই সে বলতে পারছে না। মোড়ল গলা নরম করে বলল,' তুমি এই বাড়িতে আমার আরেকটি মেয়ে। তোমার ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব আমার, যেমনটা পালন করি আমার নিজের মেয়ের প্রতি। বাবা মনে করে থাকলে কৈফিয়ত দিতে নিশ্চয় দ্বিধা নেই?'
' আসলে বাবা.. আমি... ওই।'
অহনা কি বলবে বুঝতে পারছে না‌। মাথায় এই মুহূর্তে কোনো বুদ্ধি আসছে না।
মোড়ল পুনরায় বলল,' বাবাকে কখনো তার মেয়ে ভয় পায়? শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা থাকে শুধু। আমি জানি, তুমি এমন কিছু করোনি আমার অগোচরে, যার কারণে আমি অসন্তুষ্ট হতে পারি। কেন বাড়ির বাইরে গিয়েছিলে? তাও আবার জানালা বেয়ে। একা একা বের হলে কেন? আমি শুধু জানতে চেয়েছি।'
অহনা বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে সাহস সঞ্চয় করে বলল,' বাবা, আমার নদীর পাড়ে যেতে খুব ইচ্ছে করছিল, তাই গেলাম। সন্ধ্যায়তো বের হতে দেবে না মা, মঙ্গল মনে করেন না। তাই কাউকে না জানিয়ে গেলাম।'
' ঠিক আছে! তোমার ইচ্ছে হয়েছে, আরিশকে বলতে। আরিশ তোমাকে নিয়ে যেত। একা একা এভাবে বের হ‌ওয়াটা কি ঠিক হলো?'
' স্যরি বাবা, আর কখনো এমন ভুল হবে না। আর কখনো না বলে যাব না।'
' তুমি হয়তো আমাদের নিজের পরিবার মনে করো না। তাই বলার প্রয়োজন মনে করোনি। আমি তোমার এই আচরণে খুব কষ্ট পেয়েছি।'
অহনার অনুতাপ হয়। যারা এত ভালোবাসা দিল, তাদের নাকি সে কষ্ট দিল। মনে হলো, মাহতিমের সাথে চলে গেলে বাড়ির প্রতিটি সদস্য খুব কষ্ট পাবে।
অহনা ছলছল চোখে মোড়লের দিকে তাকায়,' বাবা, আমি বুঝতে পারিনি। একবার মাফ করে দিন। আর কখনো এমনটা করব না। না বলে কোথাও যাব না।'
মোড়ল কঠোর হয়ে যায়। ঘর থেকে বের হতে গেলেই অহনা বলল,' বাবা চলে যাওয়ার পর আপনিই আমার বাবা। এই পরিবারটাই আমার পরিবার। আমি কখনো ভাবিনি সব হারিয়েও সব পেয়ে যাব। আমিতো আপনার মেয়ে তাই না? মেয়েকে কি ক্ষমা করে দিতে পারেন না?'
মোড়ল বলল,' অপরাধ করলেই তো ক্ষমা করব। তুমি অপরাধ করোনি। করেছে আরিশ, শা'স্তি তাকেই দেব।'
অহনা অবাক হয়ে বলল,' ওনার দোষ নেই। ওনিতো জানেইনা আমি নদীর পাড়ে গিয়েছিলাম।'
' ওর শা'স্তির কারণ হলো, ও তোমার খেয়াল রাখেনি। না হয় এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে না তুমি। এই ঘরটা হয়তো তোমার কাছে বন্দিঘর মনে হয়। ওর উচিত ছিল তোমাকে নিয়ে মাঝে মাঝে বাইরে ঘুরতে যাওয়া।'
মোড়ল বেরিয়েই আরিশের ঘরে যায়। আরিশ নিজের ঘরে ছিল না। মোড়ল তাকে কল করে। নট রিচেবল বলছে। কয়েকবার চেষ্টা করেও তাকে ফোনে পেল না। চিন্তার ভাঁজ পড়ে মোড়লের কপালে।
কিছুক্ষণ পরপরই তিনি আরিশকে কল করে। বার বার নট রিচেবল বলছে।
রাত একটায় রূপ নিল। এখনো আরিশের আসার নাম নেই। লাবণী সেই সন্ধ্যা থেকে আরিশের ঘরে বসে আছে। কারো চোখে নিদ নেই। আয়শা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।
আরিশ কখনো এতটা দেরি করে না। যখন দেরি হতো, আগে থেকেই কল করে বলে দিত, সে আসতে পারবে না। এবার বলেনি। প্রতিটি সদস্য আরিশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে।
বৈঠকখানায় সবাই মুখ ভার করে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগেই ইন্সপেক্টর রিজু এসেছিল। তিনি সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গেছেন। কেউ তেমন কিছুই বলতে পারল না।
আদ্রিতা, লাবণী, রুমি, অহনা আরিশের ঘরে বসে ছিল। লাবনী কখন থেকে কেঁদেই যাচ্ছে। সে জানতো আরিশ ভয়ঙ্কর সব কাজেও নিজেকে একা ছেঁড়ে দেয়। কখনো নিজের প্রাণের পরোয়া করে না। কোথায় আছে, কি অবস্থায় আছে! চিন্তায় কিছু ভাবতে পারছে না।
রাত আরো গভীর হয়, না আরিশ আসছে না তার কোনো খবর। এক পর্যায়ে রুমি অহনাকে বলল,' বিকেলে জীজুকে দেখলাম কারো সাথে ফোনে কথা বলছিল।'
লাবণী উৎসুক হয়ে রুমির দিকে এগিয়ে আসে,' কার সাথে কথা বলছিল? তুমি কিছু জানো? বলো আমাকে।'
' তেমন কিছু না, তবে আনাম মৃধা নামক কাউকে নিয়ে কথা বলছিল। আমি শুধু এই নামটাই শুনেছি।'
' তুই সেটা আগে বলতি। হয়তো এটা থেকে কোনো সূত্র পাওয়া যেত।' কথাটা বলেই অহনা ইন্সপেক্টর রিজুকে কল করে আনাম মৃধা সম্পর্কে বলে।
সকালবেলা সবার চোখ নিভু নিভু। কেউ ঘুমায়নি। বাড়ির ছেলেকে যথাসময়ে বাড়িতে ফিরতে না দেখে সবার মনের অবস্থা ঠিক ছিল না।
আরিশ অচেতন অবস্থায় ছিল অনেক সময়। চোখ খুলতেই দেখতে পায় একটা ঘরে সে বন্দি অবস্থায় রয়েছে। হাত পা বাঁধা তার। ঘরটার চারিদিকে তাকিয়ে দেখল, চারপাশে অনেক ফাইল জমা রয়েছে। মনে হচ্ছে হাজার বছরের পুরনো ঘর এটা। কাগজের স্তুপ অনেক।
আরিশ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে, পারেনা। মাথায় প্রচন্ড ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি ছিঁড়ে যাবে।
দরজা খোলার খটখট শব্দ হতেই আরিশ চমকে উঠে। প্রবেশ করে আনাম। হাতে সিগারেট, মোটা ফ্রেমের চশমা পরেছে। আরিশের মুখ বরাবর এগিয়ে এসে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে,
' আমার সম্পর্কে জানার খুব আগ্রহ ছিল তাই না? তোমার মতো হাজারো অফিসারকে পায়ে পিষেছি আমি।'
আনামের চোখে মুখে হিংস্র হাসি। নিজেকে সে অনেক চতুর দাবি করছে। হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে। তড়িঘড়ি হয়ে বেরিয়ে যায়। একটা লোককে ডেকে বলল আরিশের খেয়াল রাখতে। যেন পালাতে না পারে।
আরিশের হাতে পায়ে বাঁধন। সে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে সফল হয়। এক হাতের বাঁধন খুলতে সক্ষম হয়। অনেক কষ্টে পকেট থেকে ফোনটা বের করে। সাথে সাথেই নাম্বার টাইপ করে। ইন্সপেক্টর রিজুকে কল করে। লোকেশন বলে দেয়।
রিজু কয়েকজন কন্সটেবল নিয়ে পৌঁছে যায় ময়নামতি। আরিশের দেওয়া লোকেশন অনুযায়ী তারা বিজ্ঞান কলেজে তল্লাশি নেয়। স্টোর রুমে আরিশকে বন্দি অবস্থায় পেয়ে যায়। পাহারাদারকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
আরিশ আনাম মৃধার সমস্ত কর্মকান্ডের কথা বলে দেয়। বিজ্ঞান কলেজের স্টোর থেকেই তার সমস্ত ফাইল খুঁজে পায়।
আনাম মৃধা ভেবেছিল কেউ তার সম্পর্কে জানতে পারবে না। তাই সে অনায়াসেই কনফারেন্সে যোগ দেয়। যেখানে গিয়ে প্রথমেই আরিশ সমস্ত লোকের সামনে তাকে অপরাধী শনাক্ত করে।
বাড়িতে খবর দিয়েছিল আরিশ ঠিক আছে। এগারোটায় মোড়ল গিয়ে তাকে নিয়ে আসে। বাড়িতে সবার শান্তি ফিরে আসে আরিশকে দেখে।
বিকেলে আরিশ ঘুমিয়ে ছিল। অনেকটা আ'ঘাত পেয়েছে মাথায়। তাই এপাশ ওপাশ করছে। স্বস্তিমতো সে শুতে পারছে না।
অহনা আসলো আরিশের ঘরে। তাকে এমন এপাশ ওপাশ করতে দেখে মায়া হয় অহনার, বলল,' কষ্ট হচ্ছে খুব?'
আরিশ চোখ মেলে দেখে। এই মুহূর্তে অহনার চোখজোড়া দেখে সে সুস্থ। মনে হচ্ছে কখনো কোনো ব্যথা ছিল না। চক্ষু শীতল করা চাহনীই তার সুস্থতার কারণ।
অহনা আবার বলল,' আপনার কষ্ট হচ্ছে তাই না? আমি কি সাহায্য করব?'
' আমি ঠিক আছি। মাহতিম কোথায়?'
' সে ঘরেই আছে। পুরনো এলবাম দেখছে।'
' তুমি বরং তার কাছে যাও। এখানে আসা উচিত হয়নি।'
' আপনাকে দেখতে এসেছি। কাল থেকেই সবাই আপনার জন্য চিন্তা করছিল। আপনি আসার পর সবটা ঠিক হলো। আসার পর তেমন কথা বলতে পারিনি, তাই দেখতে এলাম।'
' তোমার কি চিন্তা হয়েছিল?'
অহনা নিশ্চুপ। আরিশ তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। উঠে বসতে চাইলে ঘাড়ে ব্যথা অনুভব করল। 'উঁহ' শব্দ করতেই অহনা তাকে সামলানোর জন্য ধরতে গেলেই কোথা থেকে লাবণী এসে ধরে নেয়,' তুমি ঠিক আছ? খুব বেশি ব্যথা করছে?'
আরিশ লাবণীকে ছেড়ে দিতে বলে,' আমি ঠিক আছি। এখন অনেকটাই ব্যাটার। তোমরা দুজন‌ই আসতে পারো এখন। আমার বিশ্রামের দরকার।'
' আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো না। কিন্তু তোমার সেবা করতে অন্তত দাও। একদম চুপ থাকবে, আমি ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছি।'
অহনা মৃদু হেসে বলল,' আসি তাহলে।'
লাবণী আরিশের ঘাড় ম্যাসাজ করে দেয়। আরিশের কষ্টে সেও কষ্ট পাচ্ছে। মনে মনে ফরিয়াদ করছে, কষ্টটা যেন আরিশের না হয়ে তার হয়। টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে আরিশের ঘাড়ে।
আচমকা টের পায় আরিশ। লাবণীকে বলল,' ঠিক আছে, আর কিছু করতে হবে না। তুমি নিজের ঘরে যাও।'
লাবণী ছেড়ে দেয়। ঘর থেকে যাবার প্রস্তুতি নিয়েই আবার ফিরে আসে,
'তুমি কি সত্যি কখনো আমাকে ভালোবাসতে পারবে না?'
আরিশ শার্ট গায়ে দিয়ে নেয়। লাবণীর দিকে একবার নজর দিয়ে আবার গুটিয়ে নেয়,' এক মন কয়জনকে দেওয়া যায়? কোনো উপায় কি আছে? থাকলে বলো, সে উপায়েই না হয় তোমাকে ভালোবাসবো।'
' কি জাদু করেছে এই অহনা তোমাকে? কাল কি সত্যি তাকে বিয়ে করে নেবে?'
' কাল সম্পর্কে বলতে পারছি না। তবে ওকে আমি পাব না।'
' যদি ও তোমাকে বিয়ে করে নেয় কাল, তাহলে আমার সুইসা'ইড করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।'
' এসব পাগলামো একদম করতে যাবে না। জীবন আল্লাহর মহৎ দান। তুমি চাইলেই তা নষ্ট করতে পারো না। তাই চাইব তুমি তোমার লাইফ এনজয় করো। যে তোমাকে ভালোবাসবে, তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নাও। আমি চাই তুমি সুখী হ‌ও।'
' তুমি বললে না, এক মন কয়জনকে দেওয়া যায়? আশা করি উত্তর তোমার জানা। আমি কখনোই অন্য কাউকে মেনে নিতে পারব না। হয়তো তুমি থাকবে জীবনে আর না হয় জীবনটাই থাকবে না।'