#ছায়া_মানব
৭১ তম পর্ব
#সাথী_ইসলাম
আরিশের সম্পূর্ণ কথা শেষ না হতেই আদ্রিতা এসে পড়ে। অপ্রস্তুত হয়ে মাহতিম সরে যায়। আরিশ বাহানা দিয়ে আদ্রিতাকে বের করতে চায়। কিন্তু সে যেতে অনিচ্ছুক। অহনার পাশে এসে বসে। একটা ললিপপ দিয়ে বলে,' ভাইয়াকে ঘর থেকে বের করে দাও, গোপন কথা আছে।'
' সারাদিনতো পুতুল ভাবীকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেই দিন কাটিয়ে দাও, ভয়ে কথা বলতেও পারোনা। এবার বলো, পিচ্চি কে?'
আরিশ লজ্জা পেয়ে যায়। এমন অবস্থায় সে আদ্রিতার মাথায় গাট্টা মেরে বাইরে চলে যায়। আর একটু দেরি করলে মান ই'জ্জতের ফালুদা বানিয়ে ফেলবে। ছোট বোন মানেই কাল নাগিনী। যখন তখন কথার ছোবল মারে।
আরিশ বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করে কখন আদ্রিতা বের হবে আর সে ইভিল স্প্রিট নিয়ে কথা বলতে পারবে। এরই মাঝে তার কল আসে। একজন ইনচার্জ কল করেছে। তাকে আরিশ দায়িত্ব দিয়েছিল আনাম মৃধা সম্পর্কে তথ্য দিতে। তার পুরো দিনের ডিটেইলস দিতে।
আরিশ জানতো, প্রতিটি অপরাধী অপরাধ করার পর কোনো না কোনো প্রমাণ রেখে যায় বা সেই প্রমাণ লোপাট করার জন্য আগের জায়গায় ফিরে যায়। কেউবা অপরাধপ্রবণ জায়গায় অনেকবার যেতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আরিশও এটার সুযোগ নিয়েছে। সে আনাম মৃধাকে গোপন কিছু সূত্র দেয় অপরাধীদের নিয়ে এবং বলে, সে অপরাধী ধরতে পেরেছে। আর কোনো অপরাধী আপাতত নেই এটা দেশে। আনাম মৃধা স্বস্তির নিশ্বাস নেয়। তিনি মনে করেছেন অপরাধী ধরা পড়ে যাওয়ার পর কেউ তাকে সন্দেহ করবে না। যদি সন্দেহ না থাকে তাহলে তিনি নিজের অবৈধ কাজগুলো অনায়াসেই করতে পারবেন।
আরিশের মতলব ছিল এটাই। সে ভেবে চিন্তে মিথ্যে বলেছে, যেন আনাম তার কাজ চালিয়ে যায় এবং আরিশ সহজেই ধরে নিতে পারে।
কল থেকে জানতে পারে আনামের গুপ্ত ঘাঁটি ছিল কুমিল্লার ময়নামতিতে। সেখানকার বিজ্ঞান কলেজের প্রিন্সিপালও তার সাথে জড়িত। কলেজের পেছনে গুপ্ত ঘর রয়েছে, সেখানেই তারা তাদের গোপন অ'স্ত্র রাখে।
আরিশের হাতে প্রমাণ আসতেই সে আর দেরি করেনি। রওনা দিল ময়নামতির উদ্দেশ্যে। সাথে কাউকে নেয়নি। সে চেয়েছিল কাজটা নিজেই সামলে নেবে।
আদ্রিতা পা নাচিয়ে নাচিয়ে অহনাকে অনেক কথা বলল। অহনাও বসে বসে তার কথাগুলো শুনতে থাকে। যেহেতু আগের সব কথা মনে পড়ে গেছে। তাই অনেকটাই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। অহনা ছোট থেকেই খুব গম্ভীর ছিল। সবার সাথে কম কথা বলতো। কিন্তু মাহতিম জীবনে আসার পর থেকে রং পাল্টাতে শুরু করে। সে অনেকটাই চঞ্চল হয়ে ওঠে। অবশ্য তার জন্য অনেক জ্বালা সহ্য করতে হয়েছে মাহতিমকে। ভালোবাসার জন্য অদ্ভুত সব কান্ডও করতে হয়েছে।
এক পর্যায়ে আদ্রিতা বলল,' পুতুল ভাবী, তুমি কি আরিশ ভাইয়াকে খুব ভালোবাসো?'
অহনা উত্তর দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পায় না। আমতা আমতা করেও কিছু মুখে আনতে পারল না।
আদ্রিতা নিজে থেকেই আবার বলল,' আমি জানি, তুমি ভাইয়াকে অনেক ভালোবাসো, ভাইয়াও বাসে। তবে ভাইয়ার ভালোবাসা একটু বেশি। কিন্তু আরেকজন ভাইয়াকে খুব ভালোবাসে, হয়তো তোমার থেকে বেশি।'
অহনা জেনেও না জানার ভান ধরে জিজ্ঞেস করল,' কে সে?'
' আগে বলো, হার্ট হবে না?'
' একদম না। ভালোবাসা হচ্ছে মনের এক প্রকার ব্যাধি। এই ব্যাধি যার হয় সেই বুঝে ভেতরের ভয়াবহতা। তুমি বলো, আমি কিছু মনে করব না।'
' লাবণী আপু ভাইয়াকে অনেক ভালোবাসে, কিন্তু ভাইয়া বাসে না। আবার দেখো তুমি আর ভাইয়া দুজন দুজনকে ভালবাসো, এখন বলো আমি কি করব? আমি না, এসব ভাবতে গিয়ে নিজেই সব গুলিয়ে ফেলেছি। লাবণী আপুর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। যদি তোমার একটা হ্যান্ডসাম ভাই থাকতো তাহলে তাকে বলতাম লাবণী আপুকে ভালোবেসে ভাইয়ার কথা ভুলিয়ে দিতে। এখন কি করব?'
' এত ভাবছ কেন? তোমার ভাইয়ার সাথে লাবণীকে দেখবে তুমি!'
' কিইই! তুমি কি বিয়ে করবে না?'
' তুমিইতো বললে, লাবণী আরিশকে ভালোবাসে।'
' তাই বলে তুমি লাবণী আপুকে ভাইয়ার সাথে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করবে নাকি?'
' তাহলে কি করব?'
' উফফ্! তোমাকে বুঝাতে পারছি না। আমি চাই লাবণী আপু কষ্ট না পাক। দেখো আমি বলি, তোমরা আর ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, চাইলেও এখন আর ভাঙতে পারবে না। কিন্তু আমরা চাইলেই লাবণী আপুকে ঠিক করতে পারি। তার জন্য আমাদের কিছু করা উচিত।'
' ওহ আচ্ছা।'
' শুধু আচ্ছা?'
' আর কি বলব?'
' কি করব সেটাতো প্ল্যান করতে হবে।'
' তুমি এখন যাও। পরে কিছু ভেবে বলব আমি তোমাকে।'
আদ্রিতা চলে যায়। অহনা মাহতিমের কাছে যায়। দুজনে মিলে বারান্দায় গিয়ে বসে। চন্দ্র বিলাস করে তারা। মাহতিমের কাঁধে মাথা রেখেছে অহনা। প্রশান্তিতে দুজন হাতের উপর হাত রাখে। মাহতিম আগ্রহ বশত বলল,' আমাকে চিনতে না তুমি, তাও কেন এত বিশ্বাস নিয়ে ভালোবাসলে?'
অহনা মৃদু হাসে,' তুমি কি চাইছিলে, আমি তোমাকে রিজেক্ট করে দিই?'
' না, তবে কিছু না জেনে শুনে কেন তুমি আমাকে এতটা প্রিয় বানিয়ে নিলে? আমার পরিবার, পরিজন নেই জেনেও।'
' বলতে পারব না। আমার তোমাকে খুব আপন মনে হয়েছিল। তোমাকে কাছে পেলেই আমার মনটা তৃপ্তি পেত।'
' এখনো কি সেই তৃপ্তি আছে?'
' এখন শুধু তৃপ্তি না। ভালোবাসার উইল আছে। যেটা একবছর আগে থেকেই ছিল। এবার সেটা পূর্ণতা পাবে। আমার আর তোমরা বিয়ে হবে। তারপর সমুদ্রের পাড়ে একটা ছোট্ট বাড়ি করে দুজনে থাকব। আমাদের আটশ বাচ্চা হবে।'
মাহতিম গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,' আটশ একটু কম হয়ে গেল না? আমিতো ভেবেছি বারোশ হবে।'
' সামলাবে কে?'
' তুমি!'
' না, তুমি।'
' আমরা দুজনেই।'
পরপরই দুজনেই হেসে উঠে। অহনা লাজুক দৃষ্টিতে তাকায় মাহতিমের দিকে। আজকের তাকানো ভিন্ন। ঠিক আগে যেমন ছিল। মাঝখানের পরিবর্তনে সব পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। এখন তা আবার ফেরত এলো।
অহনা মাহতিমের আঙুলের ভাঁজে আঙুল রেখে বলে,' এইযে ধরলাম, এই হাত কখনো ছাড়বো না।'
অহনা মাহতিমের বুকে হাত রাখে,' তোমার প্রতিটা স্পন্দনে আমি থাকতে চাই। সারাজীবন এভাবেই থাকতে চাই। যদি অমরত্ব পেয়ে যেতাম, তাহলে তুমি আর আমি এক হয়ে থাকতে পারতাম।'
অহনা আবারো যোগ করল,' এই চন্দ্র বিলাসে সমুদ্র দেখতে চাই। নিয়ে যাবে আমাকে?'
মাহতিম এক গাল হেসে বলল,' চলো তবে। হয়তো এটাই আমাদের শেষ সমুদ্র বিলাস।'
মাহতিম অহনাকে পাঁজাকোলে করে রেলিংয়ের কাছে নিয়ে যায়। অহনা মাহতিমের গলা জড়িয়ে ধরে। মাহতিম আকাশ পথে রওনা দিতে গেলেই বুঝতে পারে, তার কোনো শক্তি নেই, কাজ করছে না কিছুই।
মাহতিম পুনরায় চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। বুঝতে পারছে খুব, শক্তি তার এক ফোঁটাও নেই। অহনাকে নামিয়ে দিয়ে বলল,' আমার কোনো শক্তি কাজ করছে না। হয়তো সব শক্তি শেষ। এখন আর কিছু করার নেই। আস্তে আস্তে আমিও শেষ হয়ে যাব।'
' এভাবে বলো না। আরিশ আসলেই একটা ব্যবস্থা করবই। আমি তোমাকে হারাতে পারব না। শক্তি নেইতো কি হয়েছে? আমরা হেঁটে যেতেতো পারি তাই না?'
' কিন্তু তুমি বের হবে কি করে?'
' আমার কাছে আইডিয়া আছে।'
' বলো শুনি।'
' ওড়ঁনা টানিয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যাব। যেই ভাবা সেই কাজ। দুজন মিলে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়।
গ্রামের সাধারণ রাস্তা। বৃষ্টি ভেজা রাত। কাঁদামাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে ফুল-পাতা। মাহতিম অহনার হাত ধরে রাস্তা দিয়ে নিয়ে আসে। তারা দুজনেই নদীর পাড়ে আসতে পেরে খুব খুশী। গা ভিজিয়ে দেয় অহনা। মাহতিম তাকে মানা করে। কিন্তু অহনা শুনে না, খুশিতে সে আত্মহারা। জীবনের সবচেয়ে বড় খুশিটা এখন তার কাছে।
মাহতিম বাঁধা দিতে পারেনা। অহনা আপনমনে পূর্ণিমাতে স্নান করছে। সেই অপরূপ সৌন্দর্য মন্ত্রমুগ্ধ নয়নে দেখছে মাহতিম। তার মনে হচ্ছে কোনো হুর বা পরী চাঁদনী রাতে নদীতে গোসল করছে।
মোড়ল সন্ধ্যায় একবার বাড়িটা টহল দিচ্ছিল। এমন সময় দেখল অহনার ঘর বরাবর ওড়ঁনা ঝুলানো। তৎক্ষণাৎ কিছু না ভেবেই অহনার ঘরে গিয়ে তাকে ডাকে। কিন্তু সাড়া পায় না। তাই সে নিশ্চিত হয় অহনা বাইরে গেছে। এভাবে চোরের মতো যাওয়াটা তার পছন্দ হয়নি। যেহুতু ওড়ঁনা ঝুলানো তাই বেশ বোঝা যাচ্ছে অহনা নিজ মর্জিতেই গিয়েছে। তাই তিনি অহনার ঘরে বসেই তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
আরিশ ময়নামতি বিজ্ঞান কলেজের দিকে পা বাড়াতেই কেউ তার মাথায় আঘা'ত করে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। এক নজর খেয়াল করে আ'ঘাত করা লোকটিকে। দেখেই আঁতকে উঠে।
চলবে....

0 মন্তব্যসমূহ