ভ্যাম্পায়ার_রহস্য

#পর্ব_৫_ও_৬_বা_শেষ_পর্ব
আমি ফ্যালফ্যাল করে হাতের দিকে তাকিয়ে আছি। এভাবে কারণ ছাড়াই হটাৎ করে হাত কিভাবে কাঁটলো বুঝতে পারছি না। এদিকে আঙুল দিয়ে এবার রক্ত বের হতে শুরু করেছে। হটাৎ খেয়াল করলাম লকেটেও এক কোণায় রক্ত। এবার আমি ভালো করে দেখে বুঝতে পারলাম যে লকেটটা ভাঙা এক পাশে। সেই ভাঙা অংশে লেগেই আমার হাত কেঁটে গিয়েছে। লকেটটা বেশ পাতলা আর অমজবুত তবে অনেক সুন্দর। আমার মনে হলো হয়তো কাল ভ্যাম্পায়ারটার সাথে ধস্তাধস্তির সময়ই এটা আমার হাত লেগেই ভেঙে গিয়েছিল। আমি তন্নতন্ন করে রুমের চারিদিকে খুজলাম কিন্তু ভাঙা অংশটা পেলাম না। এবার মনে হলো আমার রুমের ঝুড়ির কথা। রুম ক্লিন করে কাল ওখানেই সব ফেলা হয়েছে। ঝুড়ির সবকিছু ঢেলে খুজতে লাগলাম। আর অবশেষে পেয়েও গেলাম সেই ভাঙা অংশটা। এবার অনেকক্ষন চেষ্টা করে অক্ষরটা মিলিয়ে ব্যাগ থেকে সুপার গ্লু বের করে জোরা লাগিয়ে দিলাম। এবার লকেটটা সম্পুর্ন হলো। এটা দেখে আর মনেই হচ্ছে না যে ভেঙে গিয়েছিল। আসলে লকেটটাতে “V" নয় বরং “N" লেখা। তারমানে আমার ধারনাই সঠিক। ভ্যাম্পায়ারটার নাম “N" দিয়ে শুরু।
ভাবতে লাগলাম N দিয়ে কার কার নাম আছে। প্রথমেই আমার মাথায় নীলের কথা আসলো। কিন্তু নীলকে ভ্যাম্পায়ার হিসেবে মানতে পারছি না কিছুতেই। কারণ যদি ও ভ্যাম্পায়ার হয় তাহলে আমাকে সুস্থ করে তুললো কেন। ও তো ভালো করেই জানে ওর পথের সবচেয়ে বড় বাধা আমি। তারমানে নীল না অন্য কেও।
এবার ইন্সপেক্টর নাদিম এর কথা মাথায় আসতেই শুরুতেই মনে পড়লো যেদিন রাতে সেই ভ্যাম্পায়ার দেখলাম উনি তো সেদিন বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বললেন। অবশ্য সত্যি নাকি মিথ্যা কে জানে। কারণ ভ্যাম্পায়ারের প্রতিটা কেসই উনার কন্ট্রোলে। উনি চাইলেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখে উনার কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। সাথে সাথে ওনার বোন নিলিমার কথা মনে পড়লো। নিলিমাও একমাস হলো এসেছে। আর এরপর থেকেই এই ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একটা প্রমাণ খুজতে যেয়ে এতগুলো ক্লু কেন আসলো খুব বিরক্ত লাগছে নিজেরই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এই মুহুর্তে গোসল করলে আবার সবটা ঠিক হয়ে যাবে জানি আমি।
গোসল করে মাথাটা স্থির হলো। খুব ফ্রেশ লাগছে। কিন্তু সাথে সাথেই আরেক চিন্তা মাথায় ঢুকে গেল। সেদিন রাতে ইন্সপেক্টর নাদিম এর স্ত্রী বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন শুনলাম। আর মাথা নাকি ফেটেও গিয়েছিল। আর ওইদিন রাতেই তো আমিও সেই ভ্যাম্পায়ারের মাথায় আঘাত করেছিলাম। তারমানে উনিই ভ্যাম্পায়ার নন তো নিজেকে প্রশ্ন করলাম আমি। ইন্সপেক্টর নাদিমকে দ্রুত ফোন করলান। এবার নেটওয়ার্ক না পেলে আবার সেদিনের মতো উনার বাড়ি যেতে হবে মনে মনে ভেবে নিলাম। যা ভাবলাম তাই-ই হলো। নেটওয়ার্ক না পেয়ে আমাকে আবার ছুটতে হলো ইন্সপেক্টরের বাড়িতে। হটাৎ এই সময় আমাকে দেখে ইন্সপেক্টর নাদিম অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
- হটাৎ এই সময়ে? কোন ক্লু পেলে নাকি আবার?
- না তেমন কোন ক্লু পাইনি। আসলে আমি এসেছিলাম আপনার স্ত্রীর খোজ খবর নিতে। উনার শরীর এখন কেমন?
- সম্পুর্ন সুস্থ। আসলে মেডিসিনগুলো খুব দ্রুত কাজ করেছে।
- হুম তা তো বুঝতেই পারছি। আচ্ছা ওনার নাম কি?
- নিশি। কেন কি হয়েছে?
- ওহ আচ্ছা নিশি। তারমানে রাত। বেশ সুন্দর নাম ঠিক ওনার মতোই। আচ্ছা ভ্যাম্পায়ারটা কি ছেলে নাকি মেয়ে?
- এটা তো আমার চেয়ে তুমিই ভালো জানবে। আর জানবে অনিন্দ্য আর শান্ত। কারণ সেই ভ্যাম্পায়ারকে শুধু তোমরাই দেখেছ। আমার তো সেই ভাগ্য হয়নি।
- তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। তবে সত্যি বলতে আমার ওকে ছেলে বা মেয়ে কিছুই ঠিকভাবে মনে হয়নি। কারণ ও রূপ পাল্টে এসেছিলো। আর শান্তও সেদিন সে জন্য ঠিকভাবে বলতে পারেনি।
- তাই নাকি?
- হ্যা। আচ্ছা আমি এখন আসি। পরে দেখা হবে আপনার সাথে।
বের হয়ে মনে মনে ভাবলাম অবশেষে সেই ভ্যাম্পায়ার রহস্য ভেদ হতে চলেছে। ভ্যাম্পায়ারটার বোকামির কথা ভেবে খুব হাসি পাচ্ছে আমার। এবার আর দেরি করলে চলবে না। দ্রুত ভ্যাম্পায়ারটাকে শেষ করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আর এই কদিন আমাকে সাবধান থাকতে হবে।
রুমে এসেই ল্যাপটপটা নিয়ে বসলাম। ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কিত কতগুলো আর্টিকেল খুঁজে বের করলাম। এবার অনিন্দ্যর সাথে কথা বলে এখানে এক সন্যাসীর কাছে গেলাম। উনি সবটা শুনে আমাকে একটা লোহার দন্ড দিলেন। সেটি মন্ত্রপুত তবে কেবল পূর্ণিমার রাত ছাড়া কাজ করবে না। আমি আর অনিন্দ্য ওইটা নিয়ে ফিরে আসলাম।
রুমে এসে গোসল করে ফ্রেশ হলাম। অনেক খুশি লাগছে আজ। আমি আজ বুঝে গেছি কে ভ্যাম্পায়ার। এখন শুধু অপেক্ষা আগামী পূর্ণিমা রাতের। হটাৎ করে আমার রুমে একে একে অনিন্দ্য, নীল আর বাকী সবাই আসলো। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি সবার মুখের দিকে। কেও কোন কথা বলছে না। এবার আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবা ঢুকলো রুমে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বাবা বলল,
- শুভ জন্মদিন মিতুল।
বাকিরা সবাই এবার উইশ করল। অনেক ধুমধাম করে আমার জন্মদিন পালন করা হলো। এবার বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি কি উপহার চাই। আমি মাথা নিচু করে উত্তর দিলাম,
- বাবা আমি নীলকে বিয়ে করতে চাই।
আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম কারণ বাবা আমার জন্য অনিন্দ্যকে পছন্দ করে রেখেছে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবা বলল,
- আমি জানি তুই নীলকে ভালবাসিস।কিন্তু আমি নীলের মুখ থেকে শুনতে চাই ও তোকে ভালবাসে কিনা।
আমি নীলের দিকে তাকাতেই ও লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। এবার ও বলল,
- আমার সাথে আপনাকে মানায় না ম্যাম।
আমি কিছু বলার আগে আবারও বাবা ওকে বুঝিয়ে বলল আর নীলকে রাজি করালো। আমার এত আনন্দ হচ্ছিল বলার বাইরে। এবার সবাই চলে গেল। আমি নীলকে থাকতে বললাম ওর সাথে আলাদা কথা বলার জন্য। সবাই বের হয়ে যাওয়া মাত্র আমি নীলকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
- অনেক ভালবাসি।
নীলও বলল,
- আমিও ভালবাসি তবে কোনদিন এভাবে এতটা কাছে পাব ভাবিনি।
কতক্ষণ এভাবে জড়িয়ে ছিলাম জানি না। হটাৎ একটা দমকা বাতাসে আমার সম্ভিত ফিরল। আমি এবার নীলকে ওর রুমে যেতে বললাম আর আমিও জানালা দরজা ভালো করে লাগিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেদিনের রাতটা যেন আমার কাছে স্বপ্নের মতো সুন্দর ছিল। একবারের জন্যও ভ্যাম্পায়ার বা অন্য কোন চিন্তা মাথায় আসেনি। আমি শুধু নীলের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিচে নামতেই সেই পুলিশ অফিসারকে দেখে একটা বিরক্তি কাজ করলো। জিজ্ঞেস করলাম,
- এত সকাল সকাল যে? কোন ইনফরমেশন আছে নাকি?
- আবার একটা খুন।
- আবার?
- হুম ইন্সপেক্টর নাদিম এর স্ত্রী। কাল রাতে সেই ভ্যাম্পায়ারের শিকার হয়েছিলেন উনি। একই ভাবে শরীর থেকে সব রক্ত শুষে নিয়েছে ভ্যাম্পায়ারটা।
- আমিও এটাই ভাবছিলাম।
- মানে কি? আপনি আগে থেকে জানতেন উনি খুন হবেন?
- নাহ আগে থেকে জানব কেন। আসলে কাল আমার জন্মদিনে উনি বাদে সবাই এসেছিলেন তো। বাড়িতে একাই ছিলেন। তাই এমনটা মনে হলো।
- ওহ আচ্ছা। তাহলে এবার চলুন যাওয়া যাক।
ইন্সপেক্টর নাদিম এর বাড়িতে এসে দেখি উনি ওনার স্ত্রীর লাশের পাশে বসে আছেন। কিন্তু ওনার চোখে মুখে কোন কান্নার বহিঃপ্রকাশ নেই। আমার কাছে একটু অবাক লাগলো বিষয়টা।
#পর্ব_৬_বা_শেষ_পর্ব
আমি ওনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম,
- দেখুন আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝি। কিন্তু আপনি কি চান না যে ভ্যাম্পায়ারটা ধরা পরুক।
- এখন আর আমার কি করার আছে। আমার স্ত্রীকেই তো বাঁচাতে পারলে না।
- দেখুন আমি প্রমাণের অপেক্ষায় ছিলাম। আর প্রমাণ পেলাম কিন্তু তার আগেই আপনার স্ত্রীর সাথে এমনটা হয়ে গেল।
- আচ্ছা আমি তোমাকে সাহায্য করবো।
- আগামীকাল আপনি আপনার বোনকে নিয়ে আমাদের হোটেলে চলে আসবেন।
- ঠিক আছে।
আমি হোটেলে এসে বাবা, অনিন্দ্য আর বাকী সবাইকে বলে দিলাম কাল সন্ধ্যায় হোটেলের বড় রুমে চলে আসার জন্য। আমি আজ আর কারো সাথে কোন কথা বললাম না। মন টা কেন জানি না খুব খারাপ লাগছে। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি নীল খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে বলে দিলাম যে খাব না। কিন্তু ও এক প্রকার জোর করেই আমাকে খাইয়ে দিল।
সন্ধ্যায়...
ঘরে এসে দেখি সবাই আগে থেকেই এসে বসে আছে। আমি একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম টেবিলের নিচে রাখা লোহার দন্ডটার উপরে। সব ঠিক আছে দেখে এবার বললাম,
- আসলে যে কারণে আপনাদের ডেকেছি তা হলো আসল ভ্যাম্পায়ার কে তা আমি জানতে পেরেছি।
সবাই আমার কথা শুনে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আবার বলা শুরু করলাম।
- সেদিন আমি আর নীল হোটেলের বাইরে খুজতে যেয়ে একটা কাপড়ের টুকরো পেয়েছিলাম। সেটা থেকে একটা সুন্দর গন্ধ আসছিল। আমি ওই টুকরো টা রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন ওই ভ্যাম্পায়ার টা আমাকে আক্রমণ করতে আসে আর তখন সেই টুকরো টা নিয়ে যায়। কিন্তু তখন সে একটা ভুল করেছিল। আমাদের ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ওর গলায় থাকা মালার লকেটটা আমার হাতে চলে এসেছিল। সেই লকেট টা তে N লেখা ছিল। এটা দেখে আমার প্রথমেই সন্দেহ হলো নিলিমার ওপর। কারণ...
আমাকে বলতে না দিয়ে এবার নিলিমা আমার উপর বেশ রেগে গেল। ও এবার বলল,
- তার মানে তুমি সবাইকে এটাই বলতে ডেকেছ যে আমিই আসল ভ্যাম্পায়ার।
- আমাকে বলতে দিন পুরোটা। আসলে উনি একমাস হলো এই বাড়িতে এসেছেন আর তারপর থেকেই এসব ঘটনা ঘটে চলেছে। কিন্তু এরপর সন্দেহ হলো ইন্সপেক্টরের উপর। কারণ সব কেস ওনার দখলেই।
ইন্সপেক্টর এবার আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি কিছু একটা বলবেন কিন্তু তার আগেই হুট করে কারেন্ট চলে গেল। আমি এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম আগে থেকেই। সে জন্য অনিন্দ্যকে বলে রেখেছিলাম যেন মোমবাতির ব্যবস্থা করে রাখে। অনিন্দ্য মোমবাতি জ্বালাতেই সবাই দেখল ভ্যাম্পায়ারটা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। এবার ভ্যাম্পায়ার টা বলল,
- তুমি যখন আগে থেকে সবকিছু জানতেই তাহলে এত নাটক কেন করলে৷ আমি তো তোমার কোন ক্ষতি করিনি।
- তোমাকে শেষ করা খুব প্রয়োজন। নাহলে এই শহরের সব মানুষ একে একে তোমার শিকার হবে।
- কিন্তু আমাকে শেষ করা যে এত সহজ না।
এই কথা বলেই ভ্যাম্পায়ারটা আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়লো। সাথে সাথে অনিন্দ্য পেছন থেকে একটা চেয়ার ছুড়ে মারতেই ও অনিন্দ্যকে আক্রমণ করতে গেল। আর সেই সুযোগে আমি লোহার দন্ডটা দিয়ে ওর মাথায় আঘাত করলাম আর ও চিৎকার দিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। সাথে সাথেই কারেন্ট চলে আসল। সবাই অবাক হয়ে বলল,

- আরে এটা যে নীল।
নীল এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
- মিতুল কেন এটা করলে আমার সাথে? আমি তো তোমাকে ভালবেসেছিলাম। আর আমি জানি তুমিও আমাকে ভালবাসতে। বল তুমি আমাকে ভালবেসেছিলে কিনা?
আমি আর কোন কথা না বলে লোহার দন্ডটা দিয়ে নীলের মাথায় আরেকটা বারি দিলাম আর সাথে সাথেই ও মারা গেল। আমার চোখ দিয়ে দু ফোটা জল বেড়িয়ে এল। কিন্তু কাওকে বুঝতে দিলাম না৷ এবার আমি বলা শুরু করলাম,

- আসলে সেদিন ভ্যাম্পায়ারের মাথায় আঘাত করার পর যখন শুনলাম যে আপনার স্ত্রীরও মাথায় আঘাত লেগেছে তখন আমার সন্দেহ হলো আপনার স্ত্রীই আসলে ভ্যাম্পায়ার। কিন্তু ওনি মারা যাওয়ার আগের দিন আমার জন্মদিনে আমি যখন নীলকে জড়িয়ে ধরলাম তখন সেদিনের সেই কাপড়ের টুকরোর পারফিউমের গন্ধটা পেলাম। তখন আমার সন্দেহটা নিশ্চিত হলো। আর তাই আগে থেকে সব আয়োজন করে আজ এখানে সবাইকে ডাকলাম।
সবাই আমার অনেক প্রশংসা করলো আর আমি এভাবেই বিসর্জন দিলাম আমার প্রথম ভালবাসার। শুনেছি ভ্যাম্পায়ার দেরও নাকি নিজের অনুভূতি থাকে আর ওরা একবার যাকে ভালবাসে কোনদিন তার ক্ষতি করে না। হয়তো নীলও আমাকে ভালবেসেছিলো। কিন্তু সবাইকে বাঁচাতে আমার কাছে এছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।
সমাপ্ত
ভাবতে লাগলাম N দিয়ে কার কার নাম আছে। প্রথমেই আমার মাথায় নীলের কথা আসলো। কিন্তু নীলকে ভ্যাম্পায়ার হিসেবে মানতে পারছি না কিছুতেই। কারণ যদি ও ভ্যাম্পায়ার হয় তাহলে আমাকে সুস্থ করে তুললো কেন। ও তো ভালো করেই জানে ওর পথের সবচেয়ে বড় বাধা আমি। তারমানে নীল না অন্য কেও।
এবার ইন্সপেক্টর নাদিম এর কথা মাথায় আসতেই শুরুতেই মনে পড়লো যেদিন রাতে সেই ভ্যাম্পায়ার দেখলাম উনি তো সেদিন বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বললেন। অবশ্য সত্যি নাকি মিথ্যা কে জানে। কারণ ভ্যাম্পায়ারের প্রতিটা কেসই উনার কন্ট্রোলে। উনি চাইলেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখে উনার কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। সাথে সাথে ওনার বোন নিলিমার কথা মনে পড়লো। নিলিমাও একমাস হলো এসেছে। আর এরপর থেকেই এই ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একটা প্রমাণ খুজতে যেয়ে এতগুলো ক্লু কেন আসলো খুব বিরক্ত লাগছে নিজেরই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এই মুহুর্তে গোসল করলে আবার সবটা ঠিক হয়ে যাবে জানি আমি।
গোসল করে মাথাটা স্থির হলো। খুব ফ্রেশ লাগছে। কিন্তু সাথে সাথেই আরেক চিন্তা মাথায় ঢুকে গেল। সেদিন রাতে ইন্সপেক্টর নাদিম এর স্ত্রী বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন শুনলাম। আর মাথা নাকি ফেটেও গিয়েছিল। আর ওইদিন রাতেই তো আমিও সেই ভ্যাম্পায়ারের মাথায় আঘাত করেছিলাম। তারমানে উনিই ভ্যাম্পায়ার নন তো নিজেকে প্রশ্ন করলাম আমি। ইন্সপেক্টর নাদিমকে দ্রুত ফোন করলান। এবার নেটওয়ার্ক না পেলে আবার সেদিনের মতো উনার বাড়ি যেতে হবে মনে মনে ভেবে নিলাম। যা ভাবলাম তাই-ই হলো। নেটওয়ার্ক না পেয়ে আমাকে আবার ছুটতে হলো ইন্সপেক্টরের বাড়িতে। হটাৎ এই সময় আমাকে দেখে ইন্সপেক্টর নাদিম অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
- হটাৎ এই সময়ে? কোন ক্লু পেলে নাকি আবার?
- না তেমন কোন ক্লু পাইনি। আসলে আমি এসেছিলাম আপনার স্ত্রীর খোজ খবর নিতে। উনার শরীর এখন কেমন?
- সম্পুর্ন সুস্থ। আসলে মেডিসিনগুলো খুব দ্রুত কাজ করেছে।
- হুম তা তো বুঝতেই পারছি। আচ্ছা ওনার নাম কি?
- নিশি। কেন কি হয়েছে?
- ওহ আচ্ছা নিশি। তারমানে রাত। বেশ সুন্দর নাম ঠিক ওনার মতোই। আচ্ছা ভ্যাম্পায়ারটা কি ছেলে নাকি মেয়ে?
- এটা তো আমার চেয়ে তুমিই ভালো জানবে। আর জানবে অনিন্দ্য আর শান্ত। কারণ সেই ভ্যাম্পায়ারকে শুধু তোমরাই দেখেছ। আমার তো সেই ভাগ্য হয়নি।
- তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। তবে সত্যি বলতে আমার ওকে ছেলে বা মেয়ে কিছুই ঠিকভাবে মনে হয়নি। কারণ ও রূপ পাল্টে এসেছিলো। আর শান্তও সেদিন সে জন্য ঠিকভাবে বলতে পারেনি।
- তাই নাকি?
- হ্যা। আচ্ছা আমি এখন আসি। পরে দেখা হবে আপনার সাথে।
বের হয়ে মনে মনে ভাবলাম অবশেষে সেই ভ্যাম্পায়ার রহস্য ভেদ হতে চলেছে। ভ্যাম্পায়ারটার বোকামির কথা ভেবে খুব হাসি পাচ্ছে আমার। এবার আর দেরি করলে চলবে না। দ্রুত ভ্যাম্পায়ারটাকে শেষ করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আর এই কদিন আমাকে সাবধান থাকতে হবে।
রুমে এসেই ল্যাপটপটা নিয়ে বসলাম। ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কিত কতগুলো আর্টিকেল খুঁজে বের করলাম। এবার অনিন্দ্যর সাথে কথা বলে এখানে এক সন্যাসীর কাছে গেলাম। উনি সবটা শুনে আমাকে একটা লোহার দন্ড দিলেন। সেটি মন্ত্রপুত তবে কেবল পূর্ণিমার রাত ছাড়া কাজ করবে না। আমি আর অনিন্দ্য ওইটা নিয়ে ফিরে আসলাম।
রুমে এসে গোসল করে ফ্রেশ হলাম। অনেক খুশি লাগছে আজ। আমি আজ বুঝে গেছি কে ভ্যাম্পায়ার। এখন শুধু অপেক্ষা আগামী পূর্ণিমা রাতের। হটাৎ করে আমার রুমে একে একে অনিন্দ্য, নীল আর বাকী সবাই আসলো। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি সবার মুখের দিকে। কেও কোন কথা বলছে না। এবার আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবা ঢুকলো রুমে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বাবা বলল,
- শুভ জন্মদিন মিতুল।
বাকিরা সবাই এবার উইশ করল। অনেক ধুমধাম করে আমার জন্মদিন পালন করা হলো। এবার বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি কি উপহার চাই। আমি মাথা নিচু করে উত্তর দিলাম,
- বাবা আমি নীলকে বিয়ে করতে চাই।
আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম কারণ বাবা আমার জন্য অনিন্দ্যকে পছন্দ করে রেখেছে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবা বলল,
- আমি জানি তুই নীলকে ভালবাসিস।কিন্তু আমি নীলের মুখ থেকে শুনতে চাই ও তোকে ভালবাসে কিনা।
আমি নীলের দিকে তাকাতেই ও লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। এবার ও বলল,
- আমার সাথে আপনাকে মানায় না ম্যাম।
আমি কিছু বলার আগে আবারও বাবা ওকে বুঝিয়ে বলল আর নীলকে রাজি করালো। আমার এত আনন্দ হচ্ছিল বলার বাইরে। এবার সবাই চলে গেল। আমি নীলকে থাকতে বললাম ওর সাথে আলাদা কথা বলার জন্য। সবাই বের হয়ে যাওয়া মাত্র আমি নীলকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
- অনেক ভালবাসি।
নীলও বলল,
- আমিও ভালবাসি তবে কোনদিন এভাবে এতটা কাছে পাব ভাবিনি।
কতক্ষণ এভাবে জড়িয়ে ছিলাম জানি না। হটাৎ একটা দমকা বাতাসে আমার সম্ভিত ফিরল। আমি এবার নীলকে ওর রুমে যেতে বললাম আর আমিও জানালা দরজা ভালো করে লাগিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেদিনের রাতটা যেন আমার কাছে স্বপ্নের মতো সুন্দর ছিল। একবারের জন্যও ভ্যাম্পায়ার বা অন্য কোন চিন্তা মাথায় আসেনি। আমি শুধু নীলের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিচে নামতেই সেই পুলিশ অফিসারকে দেখে একটা বিরক্তি কাজ করলো। জিজ্ঞেস করলাম,
- এত সকাল সকাল যে? কোন ইনফরমেশন আছে নাকি?
- আবার একটা খুন।
- আবার?
- হুম ইন্সপেক্টর নাদিম এর স্ত্রী। কাল রাতে সেই ভ্যাম্পায়ারের শিকার হয়েছিলেন উনি। একই ভাবে শরীর থেকে সব রক্ত শুষে নিয়েছে ভ্যাম্পায়ারটা।
- আমিও এটাই ভাবছিলাম।
- মানে কি? আপনি আগে থেকে জানতেন উনি খুন হবেন?
- নাহ আগে থেকে জানব কেন। আসলে কাল আমার জন্মদিনে উনি বাদে সবাই এসেছিলেন তো। বাড়িতে একাই ছিলেন। তাই এমনটা মনে হলো।
- ওহ আচ্ছা। তাহলে এবার চলুন যাওয়া যাক।
ইন্সপেক্টর নাদিম এর বাড়িতে এসে দেখি উনি ওনার স্ত্রীর লাশের পাশে বসে আছেন। কিন্তু ওনার চোখে মুখে কোন কান্নার বহিঃপ্রকাশ নেই। আমার কাছে একটু অবাক লাগলো বিষয়টা।
#পর্ব_৬_বা_শেষ_পর্ব
আমি ওনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম,
- দেখুন আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝি। কিন্তু আপনি কি চান না যে ভ্যাম্পায়ারটা ধরা পরুক।
- এখন আর আমার কি করার আছে। আমার স্ত্রীকেই তো বাঁচাতে পারলে না।
- দেখুন আমি প্রমাণের অপেক্ষায় ছিলাম। আর প্রমাণ পেলাম কিন্তু তার আগেই আপনার স্ত্রীর সাথে এমনটা হয়ে গেল।
- আচ্ছা আমি তোমাকে সাহায্য করবো।
- আগামীকাল আপনি আপনার বোনকে নিয়ে আমাদের হোটেলে চলে আসবেন।
- ঠিক আছে।
আমি হোটেলে এসে বাবা, অনিন্দ্য আর বাকী সবাইকে বলে দিলাম কাল সন্ধ্যায় হোটেলের বড় রুমে চলে আসার জন্য। আমি আজ আর কারো সাথে কোন কথা বললাম না। মন টা কেন জানি না খুব খারাপ লাগছে। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি নীল খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে বলে দিলাম যে খাব না। কিন্তু ও এক প্রকার জোর করেই আমাকে খাইয়ে দিল।
সন্ধ্যায়...
ঘরে এসে দেখি সবাই আগে থেকেই এসে বসে আছে। আমি একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম টেবিলের নিচে রাখা লোহার দন্ডটার উপরে। সব ঠিক আছে দেখে এবার বললাম,
- আসলে যে কারণে আপনাদের ডেকেছি তা হলো আসল ভ্যাম্পায়ার কে তা আমি জানতে পেরেছি।
সবাই আমার কথা শুনে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আবার বলা শুরু করলাম।
- সেদিন আমি আর নীল হোটেলের বাইরে খুজতে যেয়ে একটা কাপড়ের টুকরো পেয়েছিলাম। সেটা থেকে একটা সুন্দর গন্ধ আসছিল। আমি ওই টুকরো টা রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন ওই ভ্যাম্পায়ার টা আমাকে আক্রমণ করতে আসে আর তখন সেই টুকরো টা নিয়ে যায়। কিন্তু তখন সে একটা ভুল করেছিল। আমাদের ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ওর গলায় থাকা মালার লকেটটা আমার হাতে চলে এসেছিল। সেই লকেট টা তে N লেখা ছিল। এটা দেখে আমার প্রথমেই সন্দেহ হলো নিলিমার ওপর। কারণ...
আমাকে বলতে না দিয়ে এবার নিলিমা আমার উপর বেশ রেগে গেল। ও এবার বলল,
- তার মানে তুমি সবাইকে এটাই বলতে ডেকেছ যে আমিই আসল ভ্যাম্পায়ার।
- আমাকে বলতে দিন পুরোটা। আসলে উনি একমাস হলো এই বাড়িতে এসেছেন আর তারপর থেকেই এসব ঘটনা ঘটে চলেছে। কিন্তু এরপর সন্দেহ হলো ইন্সপেক্টরের উপর। কারণ সব কেস ওনার দখলেই।
ইন্সপেক্টর এবার আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি কিছু একটা বলবেন কিন্তু তার আগেই হুট করে কারেন্ট চলে গেল। আমি এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম আগে থেকেই। সে জন্য অনিন্দ্যকে বলে রেখেছিলাম যেন মোমবাতির ব্যবস্থা করে রাখে। অনিন্দ্য মোমবাতি জ্বালাতেই সবাই দেখল ভ্যাম্পায়ারটা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। এবার ভ্যাম্পায়ার টা বলল,
- তুমি যখন আগে থেকে সবকিছু জানতেই তাহলে এত নাটক কেন করলে৷ আমি তো তোমার কোন ক্ষতি করিনি।
- তোমাকে শেষ করা খুব প্রয়োজন। নাহলে এই শহরের সব মানুষ একে একে তোমার শিকার হবে।
- কিন্তু আমাকে শেষ করা যে এত সহজ না।
এই কথা বলেই ভ্যাম্পায়ারটা আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়লো। সাথে সাথে অনিন্দ্য পেছন থেকে একটা চেয়ার ছুড়ে মারতেই ও অনিন্দ্যকে আক্রমণ করতে গেল। আর সেই সুযোগে আমি লোহার দন্ডটা দিয়ে ওর মাথায় আঘাত করলাম আর ও চিৎকার দিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। সাথে সাথেই কারেন্ট চলে আসল। সবাই অবাক হয়ে বলল,

- আরে এটা যে নীল।
নীল এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
- মিতুল কেন এটা করলে আমার সাথে? আমি তো তোমাকে ভালবেসেছিলাম। আর আমি জানি তুমিও আমাকে ভালবাসতে। বল তুমি আমাকে ভালবেসেছিলে কিনা?
আমি আর কোন কথা না বলে লোহার দন্ডটা দিয়ে নীলের মাথায় আরেকটা বারি দিলাম আর সাথে সাথেই ও মারা গেল। আমার চোখ দিয়ে দু ফোটা জল বেড়িয়ে এল। কিন্তু কাওকে বুঝতে দিলাম না৷ এবার আমি বলা শুরু করলাম,

- আসলে সেদিন ভ্যাম্পায়ারের মাথায় আঘাত করার পর যখন শুনলাম যে আপনার স্ত্রীরও মাথায় আঘাত লেগেছে তখন আমার সন্দেহ হলো আপনার স্ত্রীই আসলে ভ্যাম্পায়ার। কিন্তু ওনি মারা যাওয়ার আগের দিন আমার জন্মদিনে আমি যখন নীলকে জড়িয়ে ধরলাম তখন সেদিনের সেই কাপড়ের টুকরোর পারফিউমের গন্ধটা পেলাম। তখন আমার সন্দেহটা নিশ্চিত হলো। আর তাই আগে থেকে সব আয়োজন করে আজ এখানে সবাইকে ডাকলাম।
সবাই আমার অনেক প্রশংসা করলো আর আমি এভাবেই বিসর্জন দিলাম আমার প্রথম ভালবাসার। শুনেছি ভ্যাম্পায়ার দেরও নাকি নিজের অনুভূতি থাকে আর ওরা একবার যাকে ভালবাসে কোনদিন তার ক্ষতি করে না। হয়তো নীলও আমাকে ভালবেসেছিলো। কিন্তু সবাইকে বাঁচাতে আমার কাছে এছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।
সমাপ্ত
ভাবতে লাগলাম N দিয়ে কার কার নাম আছে। প্রথমেই আমার মাথায় নীলের কথা আসলো। কিন্তু নীলকে ভ্যাম্পায়ার হিসেবে মানতে পারছি না কিছুতেই। কারণ যদি ও ভ্যাম্পায়ার হয় তাহলে আমাকে সুস্থ করে তুললো কেন। ও তো ভালো করেই জানে ওর পথের সবচেয়ে বড় বাধা আমি। তারমানে নীল না অন্য কেও।
এবার ইন্সপেক্টর নাদিম এর কথা মাথায় আসতেই শুরুতেই মনে পড়লো যেদিন রাতে সেই ভ্যাম্পায়ার দেখলাম উনি তো সেদিন বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বললেন। অবশ্য সত্যি নাকি মিথ্যা কে জানে। কারণ ভ্যাম্পায়ারের প্রতিটা কেসই উনার কন্ট্রোলে। উনি চাইলেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখে উনার কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। সাথে সাথে ওনার বোন নিলিমার কথা মনে পড়লো। নিলিমাও একমাস হলো এসেছে। আর এরপর থেকেই এই ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একটা প্রমাণ খুজতে যেয়ে এতগুলো ক্লু কেন আসলো খুব বিরক্ত লাগছে নিজেরই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এই মুহুর্তে গোসল করলে আবার সবটা ঠিক হয়ে যাবে জানি আমি।
গোসল করে মাথাটা স্থির হলো। খুব ফ্রেশ লাগছে। কিন্তু সাথে সাথেই আরেক চিন্তা মাথায় ঢুকে গেল। সেদিন রাতে ইন্সপেক্টর নাদিম এর স্ত্রী বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন শুনলাম। আর মাথা নাকি ফেটেও গিয়েছিল। আর ওইদিন রাতেই তো আমিও সেই ভ্যাম্পায়ারের মাথায় আঘাত করেছিলাম। তারমানে উনিই ভ্যাম্পায়ার নন তো নিজেকে প্রশ্ন করলাম আমি। ইন্সপেক্টর নাদিমকে দ্রুত ফোন করলান। এবার নেটওয়ার্ক না পেলে আবার সেদিনের মতো উনার বাড়ি যেতে হবে মনে মনে ভেবে নিলাম। যা ভাবলাম তাই-ই হলো। নেটওয়ার্ক না পেয়ে আমাকে আবার ছুটতে হলো ইন্সপেক্টরের বাড়িতে। হটাৎ এই সময় আমাকে দেখে ইন্সপেক্টর নাদিম অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
- হটাৎ এই সময়ে? কোন ক্লু পেলে নাকি আবার?
- না তেমন কোন ক্লু পাইনি। আসলে আমি এসেছিলাম আপনার স্ত্রীর খোজ খবর নিতে। উনার শরীর এখন কেমন?
- সম্পুর্ন সুস্থ। আসলে মেডিসিনগুলো খুব দ্রুত কাজ করেছে।
- হুম তা তো বুঝতেই পারছি। আচ্ছা ওনার নাম কি?
- নিশি। কেন কি হয়েছে?
- ওহ আচ্ছা নিশি। তারমানে রাত। বেশ সুন্দর নাম ঠিক ওনার মতোই। আচ্ছা ভ্যাম্পায়ারটা কি ছেলে নাকি মেয়ে?
- এটা তো আমার চেয়ে তুমিই ভালো জানবে। আর জানবে অনিন্দ্য আর শান্ত। কারণ সেই ভ্যাম্পায়ারকে শুধু তোমরাই দেখেছ। আমার তো সেই ভাগ্য হয়নি।
- তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। তবে সত্যি বলতে আমার ওকে ছেলে বা মেয়ে কিছুই ঠিকভাবে মনে হয়নি। কারণ ও রূপ পাল্টে এসেছিলো। আর শান্তও সেদিন সে জন্য ঠিকভাবে বলতে পারেনি।
- তাই নাকি?
- হ্যা। আচ্ছা আমি এখন আসি। পরে দেখা হবে আপনার সাথে।
বের হয়ে মনে মনে ভাবলাম অবশেষে সেই ভ্যাম্পায়ার রহস্য ভেদ হতে চলেছে। ভ্যাম্পায়ারটার বোকামির কথা ভেবে খুব হাসি পাচ্ছে আমার। এবার আর দেরি করলে চলবে না। দ্রুত ভ্যাম্পায়ারটাকে শেষ করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আর এই কদিন আমাকে সাবধান থাকতে হবে।
রুমে এসেই ল্যাপটপটা নিয়ে বসলাম। ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কিত কতগুলো আর্টিকেল খুঁজে বের করলাম। এবার অনিন্দ্যর সাথে কথা বলে এখানে এক সন্যাসীর কাছে গেলাম। উনি সবটা শুনে আমাকে একটা লোহার দন্ড দিলেন। সেটি মন্ত্রপুত তবে কেবল পূর্ণিমার রাত ছাড়া কাজ করবে না। আমি আর অনিন্দ্য ওইটা নিয়ে ফিরে আসলাম।
রুমে এসে গোসল করে ফ্রেশ হলাম। অনেক খুশি লাগছে আজ। আমি আজ বুঝে গেছি কে ভ্যাম্পায়ার। এখন শুধু অপেক্ষা আগামী পূর্ণিমা রাতের। হটাৎ করে আমার রুমে একে একে অনিন্দ্য, নীল আর বাকী সবাই আসলো। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি সবার মুখের দিকে। কেও কোন কথা বলছে না। এবার আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবা ঢুকলো রুমে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বাবা বলল,
- শুভ জন্মদিন মিতুল।
বাকিরা সবাই এবার উইশ করল। অনেক ধুমধাম করে আমার জন্মদিন পালন করা হলো। এবার বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি কি উপহার চাই। আমি মাথা নিচু করে উত্তর দিলাম,
- বাবা আমি নীলকে বিয়ে করতে চাই।
আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম কারণ বাবা আমার জন্য অনিন্দ্যকে পছন্দ করে রেখেছে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবা বলল,
- আমি জানি তুই নীলকে ভালবাসিস।কিন্তু আমি নীলের মুখ থেকে শুনতে চাই ও তোকে ভালবাসে কিনা।
আমি নীলের দিকে তাকাতেই ও লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। এবার ও বলল,
- আমার সাথে আপনাকে মানায় না ম্যাম।
আমি কিছু বলার আগে আবারও বাবা ওকে বুঝিয়ে বলল আর নীলকে রাজি করালো। আমার এত আনন্দ হচ্ছিল বলার বাইরে। এবার সবাই চলে গেল। আমি নীলকে থাকতে বললাম ওর সাথে আলাদা কথা বলার জন্য। সবাই বের হয়ে যাওয়া মাত্র আমি নীলকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
- অনেক ভালবাসি।
নীলও বলল,
- আমিও ভালবাসি তবে কোনদিন এভাবে এতটা কাছে পাব ভাবিনি।
কতক্ষণ এভাবে জড়িয়ে ছিলাম জানি না। হটাৎ একটা দমকা বাতাসে আমার সম্ভিত ফিরল। আমি এবার নীলকে ওর রুমে যেতে বললাম আর আমিও জানালা দরজা ভালো করে লাগিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেদিনের রাতটা যেন আমার কাছে স্বপ্নের মতো সুন্দর ছিল। একবারের জন্যও ভ্যাম্পায়ার বা অন্য কোন চিন্তা মাথায় আসেনি। আমি শুধু নীলের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিচে নামতেই সেই পুলিশ অফিসারকে দেখে একটা বিরক্তি কাজ করলো। জিজ্ঞেস করলাম,
- এত সকাল সকাল যে? কোন ইনফরমেশন আছে নাকি?
- আবার একটা খুন।
- আবার?
- হুম ইন্সপেক্টর নাদিম এর স্ত্রী। কাল রাতে সেই ভ্যাম্পায়ারের শিকার হয়েছিলেন উনি। একই ভাবে শরীর থেকে সব রক্ত শুষে নিয়েছে ভ্যাম্পায়ারটা।
- আমিও এটাই ভাবছিলাম।
- মানে কি? আপনি আগে থেকে জানতেন উনি খুন হবেন?
- নাহ আগে থেকে জানব কেন। আসলে কাল আমার জন্মদিনে উনি বাদে সবাই এসেছিলেন তো। বাড়িতে একাই ছিলেন। তাই এমনটা মনে হলো।
- ওহ আচ্ছা। তাহলে এবার চলুন যাওয়া যাক।
ইন্সপেক্টর নাদিম এর বাড়িতে এসে দেখি উনি ওনার স্ত্রীর লাশের পাশে বসে আছেন। কিন্তু ওনার চোখে মুখে কোন কান্নার বহিঃপ্রকাশ নেই। আমার কাছে একটু অবাক লাগলো বিষয়টা।
#পর্ব_৬_বা_শেষ_পর্ব
আমি ওনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম,
- দেখুন আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝি। কিন্তু আপনি কি চান না যে ভ্যাম্পায়ারটা ধরা পরুক।
- এখন আর আমার কি করার আছে। আমার স্ত্রীকেই তো বাঁচাতে পারলে না।
- দেখুন আমি প্রমাণের অপেক্ষায় ছিলাম। আর প্রমাণ পেলাম কিন্তু তার আগেই আপনার স্ত্রীর সাথে এমনটা হয়ে গেল।
- আচ্ছা আমি তোমাকে সাহায্য করবো।
- আগামীকাল আপনি আপনার বোনকে নিয়ে আমাদের হোটেলে চলে আসবেন।
- ঠিক আছে।
আমি হোটেলে এসে বাবা, অনিন্দ্য আর বাকী সবাইকে বলে দিলাম কাল সন্ধ্যায় হোটেলের বড় রুমে চলে আসার জন্য। আমি আজ আর কারো সাথে কোন কথা বললাম না। মন টা কেন জানি না খুব খারাপ লাগছে। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি নীল খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে বলে দিলাম যে খাব না। কিন্তু ও এক প্রকার জোর করেই আমাকে খাইয়ে দিল।
সন্ধ্যায়...
ঘরে এসে দেখি সবাই আগে থেকেই এসে বসে আছে। আমি একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম টেবিলের নিচে রাখা লোহার দন্ডটার উপরে। সব ঠিক আছে দেখে এবার বললাম,
- আসলে যে কারণে আপনাদের ডেকেছি তা হলো আসল ভ্যাম্পায়ার কে তা আমি জানতে পেরেছি।
সবাই আমার কথা শুনে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আবার বলা শুরু করলাম।
- সেদিন আমি আর নীল হোটেলের বাইরে খুজতে যেয়ে একটা কাপড়ের টুকরো পেয়েছিলাম। সেটা থেকে একটা সুন্দর গন্ধ আসছিল। আমি ওই টুকরো টা রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন ওই ভ্যাম্পায়ার টা আমাকে আক্রমণ করতে আসে আর তখন সেই টুকরো টা নিয়ে যায়। কিন্তু তখন সে একটা ভুল করেছিল। আমাদের ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ওর গলায় থাকা মালার লকেটটা আমার হাতে চলে এসেছিল। সেই লকেট টা তে N লেখা ছিল। এটা দেখে আমার প্রথমেই সন্দেহ হলো নিলিমার ওপর। কারণ...
আমাকে বলতে না দিয়ে এবার নিলিমা আমার উপর বেশ রেগে গেল। ও এবার বলল,
- তার মানে তুমি সবাইকে এটাই বলতে ডেকেছ যে আমিই আসল ভ্যাম্পায়ার।
- আমাকে বলতে দিন পুরোটা। আসলে উনি একমাস হলো এই বাড়িতে এসেছেন আর তারপর থেকেই এসব ঘটনা ঘটে চলেছে। কিন্তু এরপর সন্দেহ হলো ইন্সপেক্টরের উপর। কারণ সব কেস ওনার দখলেই।
ইন্সপেক্টর এবার আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি কিছু একটা বলবেন কিন্তু তার আগেই হুট করে কারেন্ট চলে গেল। আমি এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম আগে থেকেই। সে জন্য অনিন্দ্যকে বলে রেখেছিলাম যেন মোমবাতির ব্যবস্থা করে রাখে। অনিন্দ্য মোমবাতি জ্বালাতেই সবাই দেখল ভ্যাম্পায়ারটা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। এবার ভ্যাম্পায়ার টা বলল,
- তুমি যখন আগে থেকে সবকিছু জানতেই তাহলে এত নাটক কেন করলে৷ আমি তো তোমার কোন ক্ষতি করিনি।
- তোমাকে শেষ করা খুব প্রয়োজন। নাহলে এই শহরের সব মানুষ একে একে তোমার শিকার হবে।
- কিন্তু আমাকে শেষ করা যে এত সহজ না।
এই কথা বলেই ভ্যাম্পায়ারটা আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়লো। সাথে সাথে অনিন্দ্য পেছন থেকে একটা চেয়ার ছুড়ে মারতেই ও অনিন্দ্যকে আক্রমণ করতে গেল। আর সেই সুযোগে আমি লোহার দন্ডটা দিয়ে ওর মাথায় আঘাত করলাম আর ও চিৎকার দিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। সাথে সাথেই কারেন্ট চলে আসল। সবাই অবাক হয়ে বলল,

- আরে এটা যে নীল।
নীল এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
- মিতুল কেন এটা করলে আমার সাথে? আমি তো তোমাকে ভালবেসেছিলাম। আর আমি জানি তুমিও আমাকে ভালবাসতে। বল তুমি আমাকে ভালবেসেছিলে কিনা?
আমি আর কোন কথা না বলে লোহার দন্ডটা দিয়ে নীলের মাথায় আরেকটা বারি দিলাম আর সাথে সাথেই ও মারা গেল। আমার চোখ দিয়ে দু ফোটা জল বেড়িয়ে এল। কিন্তু কাওকে বুঝতে দিলাম না৷ এবার আমি বলা শুরু করলাম,

- আসলে সেদিন ভ্যাম্পায়ারের মাথায় আঘাত করার পর যখন শুনলাম যে আপনার স্ত্রীরও মাথায় আঘাত লেগেছে তখন আমার সন্দেহ হলো আপনার স্ত্রীই আসলে ভ্যাম্পায়ার। কিন্তু ওনি মারা যাওয়ার আগের দিন আমার জন্মদিনে আমি যখন নীলকে জড়িয়ে ধরলাম তখন সেদিনের সেই কাপড়ের টুকরোর পারফিউমের গন্ধটা পেলাম। তখন আমার সন্দেহটা নিশ্চিত হলো। আর তাই আগে থেকে সব আয়োজন করে আজ এখানে সবাইকে ডাকলাম।
সবাই আমার অনেক প্রশংসা করলো আর আমি এভাবেই বিসর্জন দিলাম আমার প্রথম ভালবাসার। শুনেছি ভ্যাম্পায়ার দেরও নাকি নিজের অনুভূতি থাকে আর ওরা একবার যাকে ভালবাসে কোনদিন তার ক্ষতি করে না। হয়তো নীলও আমাকে ভালবেসেছিলো। কিন্তু সবাইকে বাঁচাতে আমার কাছে এছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।
সমাপ্ত