#মৃত্তিকাশ
#সাথী_ইসলাম
#পর্ব_১
' মেয়ে মানুষের এত দেমাগ দেখাতে নেই। পরিবার যা বলে, চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে হয়। আর মুখের উপর কথা বলিস না বিয়েটা এবার করে নে মা। সমাজে যে আর মুখ দেখানো যাবে না।'
বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে মোহনা বলল,' কেন? মেয়েরা কোন দিক দিয়ে পচে গেছে? কেন মেয়েদের সব মেনে নিতে হবে? কেন সমাজে মুখ দেখানো যাবে না? কি এমন অন্যায় করেছে মেয়েরা?'
' মুখে মুখে তর্ক করিস না। ছেলে লাখে একটা। সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে। এমন ছেলে হাতছাড়া করতে পারি না। অনেক টাকা পয়সাও আছে। তুই খেয়ে শেষ করতে পারবি না।'
কোনো কথা না বলে ওঠে চলে গেল মোহনা। ভালো লাগছে না এসব শুনতে।
সকালে শুনতে পেল পাশের বাসার আন্টির গলা। একটু কান দিতেই শুনতে পায়,' তা ভাবী, মেয়ের কি সমস্যা আছে নাকি? এতগুলো ছেলে দেখাল, বিয়ে হলোনা। আমার মেয়েকেতো প্রথম দেখাতেই পছন্দ করেছে। বিয়েও হয়েছে ভালো ঘরে।'
মোহনার মা ইশতিয়া খানম বলছে,' মেয়েটা বিয়ে করতে চায় না, পড়াশোনা করতে চায়। তাই আরকি।'
' ওমা সেকি কথা? উনিশে পা দিল, দুইদিন পর কুড়িতে পা দেবে। মেয়ে মানুষ কুড়িতেই বুড়ি। খোঁজ নিয়ে দেখুন, হয়তো কারো সাথে ইটিশ ফিটিশ চলছে। মেয়ের দিকে নজর দেওয়া উচিত আপনাদের। ভাইকে কাল বললাম। পরে পস্তাতে হবে দেখে নিয়েন। মেয়ে হয়ত পালানোর চিন্তা করছে।'
' এমন কিছু না ভাবী।'
' থাক আর বলতে হবে না। চরিত্রে কালি লাগলে বুঝবে কেমন লাগে। মেয়েকে লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলছেন, কয়দিন পর দেখবেন আপনাদের মুখে চুন কালি দিয়ে কোনো ছেলের সাথে পালিয়েছে। আজকালকার ছেলেমেয়েদের বিশ্বাস নেই। কখন কি করে বসে।'
' আমার মেয়ে এমনটা করবে না কখনো। আমার ওর প্রতি বিশ্বাস আছে। ভালো করে বুঝালেই রাজি হয়ে যাবে।'
' যাই করেন, তারাতাড়ি করেন। রাস্তাঘাটে চলাফেরা করে চোখ কান খোলে গেছে। ছেলেদের সাথে চলাফেরা করে। খারাপ হয়ে গেছে মেয়ে। কয়দিন পর বংশের মুখে কালি দেবে, তাই সিদ্ধান্ত নেন।'
এসব কথা মোহনা সহ্য করতে পারল না। রেগেমেগে গেল সেখানে। মহিলাটি মোহনাকে দেখে বলল,' আসিগো এখন, অনেক কাজ বাকি।'
ইশতিয়া মোহনার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই বলল, 'ছেলের পক্ষ দেখতে আসবে আজকে। কিছু উল্টা পাল্টা বলিস না আগের মত। সবাই তোকে নিয়ে কথা বলছে। কয়েক মাস ধরেই আমি লোকসমাজের কথা শুনছি। এভাবে চললে তোর আর কখনোই বিয়ে হবে না। কোনো কূল হবে না। আল্লাহর দোহাই লাগে রাজি হয়ে যা।'
ভেতরটা পুড়ছিল মোহনার। তীব্র এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো গহীন থেকে। কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। হু হু করে উঠল বুকের ভেতরটা।
কিছুক্ষণ পর ইশতিয়া আবার এসে বলল তৈরি হতে, কিছু্ক্ষণের মধ্যেই পাত্রপক্ষ এসে যাবে। বলতে না বলতেই এসে হাজির। কি করবে এখন মোহনা? পাশের ঘর থেকে ভাবী এসে বলল,' দেখতে আসলেই বিয়ে হয়ে যায় না। কিছু হবে না, তৈরি হয়ে যাও।'
ভাবী শাড়ি পরিয়ে সাজিয়ে দিল মোহনাকে। সাজ বলতে হালকা লিপস্টিক আর খোলা চুল।
পাত্রপক্ষের সম্মুখে যেতেই চোখ ফেটে জল নেমে এলো মোহনার। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নেয়। মোহনা জানে বিয়েটা ঠিক হয়েই যাবে, কারণ আগেই তারা ছবি দেখে পছন্দ করেছে। দিন তারিখ সব ঠিক করেও নিয়েছে জিয়াওল খানমের সাথে। এখন শুধু লোক দেখানো সাক্ষাৎ করতে এসেছে। তবুও শেষ আশা হিসেবে গেল মোহনা। ভেবেছে কিছু একটা করবে অন্তত।
পাত্রের নাম নীলাদ্র। নীলাদ্র আর মোহনাকে আলাদা কথা বলার জন্য পাঠানো হয় ছাদে। সুযোগ পেয়েছে ভেবে মোহনাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। নীলাদ্র লজ্জা পাচ্ছে। মুখে জড়তার জন্য তেমন কিছু জিজ্ঞেস করল না কয়েক মিনিট। মোহনা বলেই ফেলল,' আমাকে একটা সাহায্য করবেন?'
মৃদু হেসে নীলাদ্র বলল,' বলুন।'
' আপনি সবাইকে গিয়ে বলুন, আপনার আমাকে পছন্দ হয়নি। আপনি বিয়ে করতে চান না আমাকে।'
তার মধ্যে কোনো ভাব দেখা গেল না, বলল,' বয়ফ্রেন্ড আছে?'
' জন্মগত সিঙ্গেল আমি।'
' তাহলে কেন বিয়ে করতে চান না?'
' আমি পড়াশোনা করতে চাই। আরো কত কাজ বাকি এখনো।'
' আমি বলিনি বিয়ের পর পড়াশোনা করতে পারবেন না। আপনার বাবার সাথে আগেই কথা হয়েছে এ নিয়ে, ওনি বলেছেন আপনার পড়ার প্রতি খুব আগ্রহ। তাই আমিও চাই আপনি বিয়ের পরেও পড়াশোনা চালিয়ে যান।'
' কিন্তু তবুও আমি বিয়ে করতে চাই না।'
' আর কোনো রিজন আছে কি? আপনার কি আমাকে পছন্দ হয়নি?'
' বিয়ে করতেই চাই না। পছন্দের কথা এখানে আসছে না। পছন্দের কথাটা তখনই আসবে যখন আমি বিয়ে করতে চাইব।'
' নিশ্চয় আপনার কারো সাথে রিলেশন আছে। আপনি আমাকে বলতে পারেন, আমি আপনাকে সাহায্য করব। আপনার বাবাকে বুঝিয়ে বলব।'
' উঁহু! আমার কখনো কোনো ছেলেকেই ভালো লাগেনি, রিলেশন করা দূরে থাক।'
' তাহলে বিয়ে করতে না পারার একটা কারণ বলুন। কেন আপনি আমাকে রিজেক্ট করছেন সেটা জানার ষোলো আনা অধিকার নিশ্চয় আমার আছে।'
' উফফ্! এতকিছু বলতে পারব না আমি। বিয়ে করতে চাই না ব্যাস।'
' কারণ না বললে আমি কোনটা বুঝে ডিসিশন নেব?'
কিছুক্ষণ ভেবে মোহনা বলল,' কারণ আমি নিজেও জানি না। বিয়ের কথা শুনলেই আমার খুব কান্না পায়। মনে হয় কেউ সুই'সাইড করার আদেশ করছে।'
' আপনার মা আগেই বলেছে আপনি এখনো বাচ্চা মেয়ে, লম্বা হয়ে গেছেন এখনো মাথায় বুদ্ধি হয়নি। ওনি আমাকে আগেই সতর্ক করেছেন, আপনি এসব অদ্ভুত কথা বলবেন।'
' কিইই! মা সব আগে থেকে বলে দিল? একদম ঠিক করেনি।'
' আপনি হয়তো জানেন না আপনার জন্য কতটা চিন্তা করে আপনার মা বাবা। আপনার ভালোর জন্যই তারা আপনার বিয়ে দিতে চায়।'
' বিয়ে করলে আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে।'
'কোনো স্বপ্ন শেষ হবে না। আমি কথা দিলাম সবসময় সাথে থাকব। আপনার স্বপ্নগুলো নিজের বলে পূরণ করব।'
' তাও হবে না। বিয়ে মানেই অন্যের উপর নিজের ভার ছেড়ে দেওয়া। কিছুদিন পর আপনার আমাকে বোঝা মনে হবে। আমি আগে নিজের সব স্বপ্ন পূরণ করব তারপর বিয়ে।'
' সত্যি করে বলুন আপনার কি অন্য কাউকে পছন্দ?'
মোহনার খুব রাগ হলো। কাঠকাঠ গলায় বলল,' আজ পর্যন্ত কোনো ছেলের দিকে আমি ঐরকম দৃষ্টিতে তাকিয়েও দেখিনি। কখনো ভালো লাগার মত দৃষ্টি না দিলে কিভাবে কাউকে পছন্দ থাকতে পারে? একমাত্র আমার ভাই ছাড়া আর সব ছেলেকে আমার একই মনে হয়। আমি তাদের আলাদা করে শনাক্ত করতে পারিনা। ভালো লাগা আসেনা কারো প্রতি।'
' আমার প্রতিও না?'
' আমি আপনাকে এখনো খেয়াল করিনি সেভাবে।'
' তাহলে ভালো লাগবে কি করে? কারো প্রতি ভালোলাগা আনতে হলে প্রথমত তাকে দেখতে হয় মন দিয়ে।'
'আমার আপনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে না। দয়া করে নিচে গিয়ে বলবেন আপনার আমাকে পছন্দ হয়নি, তাহলেই হবে। প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ!'
নীলাদ্র কিছু বলল না। নিচে নেমে যাওয়ার আগে বলল,' কিছু কি বলবেন না? আমি কিন্তু আপনার বন্ধু হয়ে থাকতে চাই, স্বামী নয়।'
' কিছু বলার নেই। আমার কখনো বিয়ে করতে ইচ্ছে করেনা। ইচ্ছে করবেও না কখনো। জীবনে কোনোদিন বিয়ে করব না। মানবতার ফেরিওয়ালা হয়ে থাকব আজীবন।'
নীলাদ্র মোহনার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে পুনরায় বলল,' সেটা আপনি আমার সাথেও করতে পারেন। আমরা না হয় একসাথেই সব করব।'
' উঁহু! পারব না।'
নীলাদ্র নিচে নেমে গেল। জিয়াওলকে কিছু বলতে যাবে, তখনি ইশতিয়া তাকে ডেকে নিয়ে গেল নিজের ঘরে।
এসেই নীলাভ্র সহ সবাই বিয়েতে রাজী। তারা দেরী করবে না। আজকেই বিয়ে।
মোহনার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। কিছুতেই সে বিয়ে করবে না। কিন্তু কেউতো তার কথা কানেও তুলছে না। কি করবে এখন?
চলবে....
#মৃত্তিকাশ
#সাথী_ইসলাম
২.
সাজানো হলো মোহনাকে। এক প্রকার জোর করেই তাকে বিয়ের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। মোহনার বার বার মাথা চক্কর দিচ্ছিল। বিয়েতো নয়, মনে হচ্ছে কেউ তাকে ফাঁ'সি দিতে নিয়ে যাচ্ছে। ভাবী তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় কোনোদিকে না তাকিয়ে বাড়ির সদর দরজা বরাবর দৌড় দিল। কিন্তু পারেনি দরজা পার হতে। দেখল সামনে বর বেশে দাঁড়িয়ে আছে নীলাদ্র। মোহনা সামনে পিছনে তাকিয়ে পা বাড়াতেই নীলাদ্রর বুকের সাথে ধা'ক্কা খায়। মৃদু হেসে দরজার সাথে লেপ্টে দাঁড়াল, ' উঁহু, বিয়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোথাও যাওয়া নিষেধ।'
' ইউ চিটার!'
' যা ইচ্ছা বলুন। সমস্যা নেই। কিন্তু বিয়ে আপনাকে করতেই হবে।'
মোহনা আর উপায় না পেয়ে সুড়সুড় করে গিয়ে বসে যায়। মনে মনে বলল,' বিয়েতো করব আমি, কিন্তু পরে দেখবে কেমন লাগে? বিয়ের সখ মিটিয়ে দেব নীলাদ্রর বাচ্চা নীলাদ্র। খচ্চ'র, খবিশ ছেলে।'
যথানিয়মে বিয়ে করে নেয় মোহনা। আর একটাও কথা বারায়নি। মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় ইশতিয়া খুব কান্না করে। মোহনার চোখেও জল নেমে আসে। মাকে ধরে অঝোরে কেঁদে ওঠে। সবকিছু কেমন বিষাদময় লাগছে ওর কাছে। জিয়াওল যখন এগিয়ে আসে মোহনার দিকে তখনই দু'কদম পিছিয়ে যায় মোহনা। নীলাদ্রকে বলল,' আমাকে নিয়ে চলুন। আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে চাই না।'
জিয়াওল ওকে কয়েকবার আটকানোর চেষ্টা করে একটু কথা বলার জন্য। কিন্তু সে অবজ্ঞা করে নিজে নিজেই গাড়িতে ওঠে বসে। মায়ের দিকে তাকাতেই বুকটা খাঁ খাঁ করে ওঠে। কান্না যেন বাঁধ মানছে না।
নতুন বউয়ের এমন আচরণ দেখে বরপক্ষ অবাক। জিয়াওল বলল,' মেয়েটা ছোট, বুদ্ধি হয়নি এখনো। রাগ করেছে অনেক তাই আরকি। কিছু মনে করবেন না।'
সবাই বিদায় নিয়ে বউ নিয়ে চলে গেল। অল্প সময়ের আয়োজনে নীলাদ্রের বাড়িতে অনেক আয়োজন করা হয়েছে।
মোহনা ঘরে একা একা বসে আছে লম্বা ঘোমটা টেনে। বিরক্ত লাগছে ভীষণ কিন্তু কিছু করার নেই। একটু পরই দরজায় আওয়াজ হলো। মোহনা বুঝতে পারল নীলাদ্র এসেছে। তাই কোনো সাউন্ড না করে চুপচাপ বসে থাকে। মনে মনে তাকে গালি দিতে থাকে অগণিত।
নীলাদ্র এসেই গ্লাস থেকে পানি খেল। তারপর খাটের উপর গিয়ে বসল। মৃদু হেসে মোহনার ঘোমটা সরাতেই মোহনা একখানা ছু'রি বের করে তার গলা বরাবর ধরে বলল,' খবরদার ছুঁতেও আসবেন না। না হয় মে'রে এখানেই কব'র দিয়ে যাব।'
নীলাদ্র হেসে ওঠে। মোহনা অবাক হয়ে বলল,' হাসছেন কেন? ছু'রি দেখে কি ভয় করছে না? ভাবছেন আমি আপনাকে আঘা'ত করতে পারব না! তাইতো? ভুল ভাবছেন, আমার সাহস সম্পর্কে আপনার ধারণা নেই।'
নীলাদ্র তবুও হাসছে। মোহনা রাগে ফেটে পড়ে,' একদম চুপ! হাসলে এবার ঠোঁটগুলোও কে'টে দেব একদম।'
' একটা ফল কা'টার ছু'রি দিয়ে আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন মিসেস নীলাদ্র? হাউ ফানি! আপনি যে এটা আপনার বাড়ি থেকে এনেছেন সেটাও জানি আমি। এমন উদ্ভট কান্ড ঘটাবেন সেটাও জানি। সব খেয়াল রেখেছিলাম আমি।'
' আমার খুব রাগ হচ্ছে। এত রাগ আমি কোথায় রাখব? আপনাকে আমি....'
মোহনা নীলাদ্রর গলা চেপে ধরে। নীলাদ্র কোনোরকমে বলল,' ভয় পেয়ো না, আমি তোমার ওপর কোনো অধিকার দেখাব না। তোমার মা আমাকে আগেই বলেছে কেন তুমি বিয়ে করতে চাও না? আর এটাও জানি আমাকেও তুমি কখনো স্বামীরুপে গ্রহণ করবে না। খুব শিঘ্রই আমাদের ডিভোর্স হতে চলেছে। আমি কখনোই তোমার থেকে ভালোবাসা নামক জিনিসটা পাব না।'
মোহনা অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়,' আপনি সব জেনে আমাকে বিয়ে করেছেন?'
' হুম, আমার মনে হয়েছে সমাজের ঘ্লানি থেকে তোমাকে রক্ষা করা এবং তোমার মাথায় থাকা বাজে ধারণাকে মুছে দেওয়া।'
' আমার ধারণা মানে? আপনাকে মা সব বলে দিয়েছে?'
' একদম সব বলেছে। তারপর আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিয়ে করব তোমাকে। আর বুঝিয়ে দেব আকাশ আর মাটির মধ্যে ঠিক কি পার্থক্য!'
' আপনি আমাকে তুমি করে বলছেন কেন? আপনি করে বলুন।'
' দুঃখিত! তুমি আমার আইনত বউ, তাই তুমি করেই বলব। তুমি করে বললে ভালোবাসা বাড়ে।'
' দিবাস্বপ্নে দেখছেন?'
' ঘড়িতে দেখো! এখন দিন না রাত, আমি রাতের স্বপ্নই দেখছি।'
' আপনাকে আমার বিরক্ত লাগে।'
' লাগবেই। কারণ ছেলেদের নিয়েইতো একটা বড় ধারণা ধরে আছ! আমি চাই তোমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হোক।'
' তার আগেই আমি চলে যাব এই বাড়ি থেকে।'
' কোথায় যাবে?'
' যেখানে দু চোখ যায় সেখানে যাব তবুও আপনার কাছে থাকব না।'
নীলাদ্র কিছু বলল না। সে জানে কষ্ট থেকে মেয়েটা এমন বলছে। নীলাদ্র একপাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
মোহনা অবাক হয়ে বলল,' আমি কোথায় শোঁব?'
' আমার বুকে।'
' ল'জ্জা সরম চাঙ্গে তুলেছেন নাকি?'
নীলাদ্র এক লাফে ওঠে যায়, বলল,' আচ্ছা, আমি যদি তোমার সব ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিই তাহলে কি তুমি আমাকে ভালোবাসবে?'
' পারবেন না। আঠারো বছরের জীবনের অভিজ্ঞতা, কিভাবে মুছে দেবেন ক্ষতগুলো? এতদিনে জমা হওয়া কষ্ট কি করে একদিনে মুছে দেবেন? আদৌ কি কোনো উপায় আছে?'
' আছে! আমার কাছে আছে! তিনদিন সময় দাও। এই তিনদিনে আমি তোমার সব ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করতে পারব ইনশা'আল্লাহ। এর জন্য তোমাকে আমার সাথে থাকতে হবে, আমার কথামত আমার সাথে যেতে হবে।'
' কোথায় যাব?'
' চলো আমার সাথে, এখন থেকেই বাহাত্তর ঘন্টা পরে তুমি সিদ্ধান্ত নেবে আমার সাথে বাকি জীবন থাকবে কিনা? আমি তখন আর জোর করব না।'
' ওকে ডান।'
মোহনা কখনো বিয়ে করতে চাইত না তার পরিবারকে দেখে। ছোট থেকেই দেখে আসছে জিয়াওল তার মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। এমন কোনো দিন নেই যেদিন ইশতিয়ার গায়ে হাত তোলেনি। খাবার একটু বাজে হলে সেদিন ইশতিয়ার খাওয়া বন্ধ করে দিত। একটা রান্না বাজে হলে আরো দশটা রান্না করাতো। রমজানে সারারাতই রান্নাঘরে থাকতে হত ইশতিয়াকে। কারণ জিয়াওল হাজারটা রকমারী রান্না করতে বলতো। এর মাঝে একটা খাবার একটু খারাপ হলে মারধর করতো। ইশতিয়ার পুরো শরীরে মারের দাগ ছাড়া কিছুই নেই। সামান্য জিনিস নিয়েও ইশতিয়ার বাবা মা নিয়ে কথা তুলতো জিয়াওল। জিয়াওলের মুখের ভাষা অত্যন্ত বি'চ্ছিরি। স্ত্রী ছাড়, মেয়ের সাথেও বাজে ভাষা ব্যবহার করত। বড় একজন বিজনেসম্যান হয়েও সে কখনো মেয়েকে একটা জামা কিনে দেয়নি। কখনো অসুস্থ হলে গিয়ে একবারও জিজ্ঞেস করেনি কেমন আছে মেয়েটা! কখনো তার পড়াশোনার জন্য দুপয়সাও দেয়নি। ইশতিয়া তার বাপের বাড়ি থেকে কিছুটা এনে মেয়েকে সামলাতো, তার প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিত। এটা দেখেও জিয়াওল খুব মারতো। সে নিজেও খেয়াল রাখবে না মেয়ের, একটা জামা কিনে দেবে না কখনো আবার কেউ সাহায্য করতে এলেও তাকে বিদায় করে দেবে বি'চ্ছিরি গালিগালাজ করে। সবাই তাকে সাইকো বলে।
সমাজের ভয়ে মেয়েটাকে বিয়ে দিতে চাইছে। নতুবা টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে এটাও করত না। স্কুল পড়ুয়া মেয়ে মোহনা। কি আর করতে পারে মায়ের জন্য। আসার সময় কেঁদেছিল কারণ অনেকদিন ধরে ইশতিয়ার বুকের ব্যথাটা দেখা দিয়েছে। কিন্তু জিয়াওল ডাক্তার দেখায়নি। এই অবস্থাতেও অকথ্য অত্যা'চার করেছে। অসুস্থ মাকে একা রেখে আসতে পারছিল না মোহনা। তাই ছোট থেকেই শপথ নিয়েছে কখনো সে বিয়ে করবে না। একজন ভালো মানুষ হয়ে মাকে একটা সুন্দর জীবন দেবে। কিন্তু হলো না। এর আগেই বলি হয়ে গেল।
কেঁদে ওঠে মোহনা। নীলাদ্র হঠাৎ তার কান্না দেখে বিচলিত হয়ে যায়। তারা রাস্তার কিনারায় হাঁটছিল। নীলাদ্র মোহনাকে নিয়ে বেড়িয়েছে। কান্না জড়িত মুখ দেখে তার খুব মায়া হয়। রুমাল এগিয়ে দিয়ে বলল,' আমরা এসে গেছি।'
বলেই একটা ছোট কুঁড়েঘর ঢুকল। দরজায় করা'ঘাত করতেই এক বৃদ্ধ লোক বেড়িয়ে এলো। নীলাদ্রকে এত রাতে দেখে চমকিত সে। তার বৃদ্ধা গিন্নিকে ডেকে বলল,' আ জামির মা, দেহো কেউগা আইছে!'
মোহনা দেখল দুজন বৃদ্ধ বৃদ্ধা ছাড়া আর কেউ নেই। তারা একাই থাকে এখানে।
নীলাদ্র জিজ্ঞেস করল,' দাদা, এত রাতে বিরক্ত করলাম, কিছু মনে করবেন না। আমার বউ আপনাদের দেখতে চেয়েছে তাই নিয়ে এলাম।'
বৃদ্ধা খুশি হয়ে তাড়াতাড়ি বাতাশা দিল দম্পতিকে। মোহনা বুঝতে পারছে না কেন তারা এখানে এসেছে।
বৃদ্ধা বলল,' তা নাতি ভালা করছস। আমার জামি, আমিরেরতো মেলা কাজ, মা বাপরে দেহনেও সময় নাই। তুই মাঝে মাঝে আইয়া মনডারে শান্তি দেস।'
মোহনা বুঝতে পারল বৃদ্ধার ছেলে মেয়েরা তাদের দেখে না, তাই একা থাকে এখানে।
নীলাদ্র বলল,' দাদি, আমার বউ আমাকে ভালোবাসে না। তুমি কি বলবে কি করলে বউ ভালোবাসবে?'
বৃদ্ধা হেসে বলল,' বাসবো, বাসবো, সময় লাগবো। দুইদিনে এই পিরিতি অয় না। আমাগো বিয়ের সময় আমার বয়স ছিল আট। কিছু বুঝতাম না, খালি মারতাম তোর দাদারে। হেয় আমারে আদর করত। দিন যাইতে যাইতে এহন পিরিতি বাড়ছে। তাইতো সত্তর বছর একলগে আছি।'
' সত্তর বছর একসাথে? তোমাদের কি কখনো ঝগড়া হত না?'
' তা হইবো না ক্যা। কত ঝগড়া করতাম, পরে আবার মিলে যাইতাম। তোর দাদার আমারে ছাড়া ঘুম হইত না, তয় যত রাগ করি না ক্যান রাগ ভাঙ্গাই নিত।'
মোহনার চোখ ছলছল করে ওঠে। কত ভালোবাসা এই বৃদ্ধ দম্পতির মাঝে।
নীলাদ্র বলল,' দাদা, আপনি কি করে দাদির রাগ ভাঙাতেন?'
দাদা রস করে বলে,' বুড়ির রাগ নাই, জড়াই ধরলেই কোনো রাগ থাহে না। মিলে যাই। শেষ বয়সে কেউ লগে নাই, দুইজন দুইজনের খেয়াল রাইখাই আছি, আর কি রাগ করমু ক?'
নীলাদ্র কিছুটা বাতাশা মুখে পুরে নিয়ে বলল,' এভাবেই থাকবেন আজীবন। আমি মাঝে মাঝে দেখতে আসব। শরীরের যত্ন নেবেন।' বলেই পকেট থেকে কিছু টাকা চুপিচুপি বৃদ্ধার হাতে দিয়ে দিল।
মোহনার মনটা উষ্ণ এখন। বার বার ভাবছে, ভালোবেসে ঐ দম্পতি সত্তর বছর একসাথে। কতটা ভালোবাসা থাকলে এমনটা হয়। ভাবতে ভাবতেই সে হারিয়ে যায় ভাবনার শহরে। নীলাদ্রের কথায় ধ্যান ভাঙ্গে। বিদায় নিয়ে তারা নিরালায় হাঁটে।
নীলাদ্র বলল,'চলো, এবার পরের প্রমাণের পালা। এখান থেকে যা বুঝেছ তাই এনাফ।'
চলবে....
#মৃত্তিকাশ
#সাথী_ইসলাম
৩. ( অন্তিম )
ইশতিয়া কল করেছে সকাল সকাল। মোহনা কল ধরেই শরীরের কথা জিজ্ঞেস করল। ইশতিয়া খুব অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও মেয়েকে কিছু বলল না।
সময় গড়াতে গড়াতে এগারোটা বাজে। নীলাদ্র মোহনাকে বলল,' সময় নেই আমার সাথে। চলো কিছু দেখাব তোমাকে।'
মোহনাও রাজি হয়। তারা দুজন মিলে ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে হাঁটতে থাকে। বিভিন্ন জনকে তাদের দাম্পত্য জীবন নিয়ে জিজ্ঞেস করে। এক পর্যায়ে দেখতে পায় গলির মোড়ে একটি টং দোকানে এক দম্পতি চা বিক্রি করছে। মহিলাটি চা বানাচ্ছে আর লোকটি সেটা বিতরণ করছে বিস্কুটের সাথে। নীলাদ্র মোহনাকে সেদিকে দেখতে বলে। মোহনা দেখল একসাথে তারা কত খুশি। মধ্যবয়সী হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কত কেয়ার, কত ভালোবাসা। তারা হেসে খেলে কাজ করছে। একে অন্যকে সাহায্য করছে। অনেকটা সময় গড়িয়ে যায় তাই তারা দুপুরের খাবার খেতে বসে একসাথে। মহিলাটি তার স্বামীকে নিজে হাতে খাইয়ে দিচ্ছে। লোকটিও তার ক্লান্ত বউকে খাইয়ে দিচ্ছে।
এসব দেখে মোহনা বলল,' আমি বাড়ি যাব এখনই। আমার ভালো লাগছে না।'
নীলাদ্র আর কিছু বলল না। বাড়িতে চলে গেল।
বিয়ের নিয়ম অনুসারে মোহনাকে আজ তার বাপের বাড়ি যেতে হবে। তাই সন্ধ্যায় রওনা দেয়।
পৌঁছানোর সাথে সাথেই ইশতিয়া খুব খুশি। মেয়েকে বক্ষে জড়িয়ে ধরে পরম আবেশে। জিয়াওল কথা বলে নীলাদ্রর সাথে। মোহনার সাথে কথা বলতে আসলে সে সরে যায়। নীলাদ্র তাকে তার বাবার সাথে কথা বলতে বলে। মোহনা জিয়াওলকে শুনিয়েই বলল,' ওনি কখনো কারো বাবা হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। আমি ওনাকে ঘৃণা করি। আমার মায়ের সাথে দেখা করা শেষ এবার আমাকে নিয়ে চলুন। আমি আর থাকতে চাই না এখানে।'
নীলাদ্র ওকে আড়ালে নিয়ে বলল,' এত মানুষের সামনে এসব কি বলছ তুমি? বিয়ে দিয়েছে এটা তার দায়িত্ব। তুমি না চাইলেও তোমাকে এটা করতে হত।'
' উঁহু, ভুল করছেন। ওনি চাইলেই আমি শান্তিমত বাঁচতে পারতাম, পড়াশোনা করতে পারতাম। ওনি যদি সবাইকে বলতেন ওনার মেয়েকে ওনি অনেক পড়াতে চান কেউ যেন বিরক্ত না করে তাহলে কেউ আমার বিয়ে নিয়ে কথা বলত না। পরিবারের সাপোর্টের কারণেই হাজার হাজার মেয়ে সাবলম্বী হচ্ছে।'
নীলাদ্র কিছু বলার মত পেল না। মোহনার কথাটা ফেলে দেওয়ার মত না। কথাটা একদম খাঁটি।
রাত হতেই মোহনার আরো বিরক্ত লাগতে শুরু করে। নীলাদ্রর সাথে বার বার রাগ দেখাতে থাকে। কিছু ভালো লাগছে না ওর। উপায় না পেয়ে নীলাদ্র মোহনার খাবারে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দেয়। এর কারণে খুব শিঘ্রই ঘুমিয়ে যায়।
পরদিন সকাল সকাল মোহনা জোর করেই নীলাদ্রকে নিয়ে চলে গেল।
সন্ধ্যায় মোহনা বসে ছিল ছাদে। বাড়ির বউ সন্ধ্যায় ছাদে বসে আছে দেখে মোহনার শাশুড়ি নীলাদ্রকে বলল তাকে ডেকে আনতে।
নীলাদ্র ছাদে যেতেই দেখল মোহনা একমনে তাকিয়ে আছে দুরে। কাছে গিয়ে নীলাদ্র ডাকতেই হুঁশ ফেরে। মোহনাও তাড়াহুড়ো করে নামতে যায়। নামতে গিয়ে চোখ যায় দুটো বেড়ালের উপর। নীলাদ্র খেয়াল করে বলল,' দেখো, কত মিষ্টি বেড়ালছানা।'
' কিন্তু আমার পছন্দ না। আমি বেড়াল, কু'কুর পছন্দ করি না।'
' আমি পছন্দের কথা বলিনি। খেয়াল করে দেখো তারা একসাথে। তুমি জানো, এরা দু'বছর একসাথে আছে। তাদের খু'নসু"টি দেখেই বিকেলের সময় কাটাই আমি। তারাও একে অপরকে ভালোবাসে। তারা কিন্তু তোমার বাবার মত না।'
মোহনা কোনো কথা না বলে চলে যায়। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সে। নীলাদ্র চিন্তায় আছে।
আর মাত্র একদিন আছে, এর মাঝে যদি মোহনার ধারণা ভুল প্রমাণিত না হয় তাহলে সে মোহনাকে হারিয়ে ফেলবে। এসব ভাবতে ভাবতেই সে বারান্দায় দোলনাতেই ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন সকাল হতেই মোহনা গোছগাছ শুরু করে। তার উদ্দেশ্য বেরিয়ে যাবে। কিছু একটা কাজ জোগাড় করে নেবে। নীলাদ্র এসব দেখে চোখ কপালে তুলে বলল,' এসব কি? কোথায় যাচ্ছ?'
' চলে যাব। চাকরি করব তারপর মাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাব।'
' চারিদিকের অবস্থা জানো? চারিদিকে হায়নার দল ওঁৎ পেতে আছে। একা একটা মেয়ে হয়ে কি করবে তুমি? এখানে কাউকে চেনো? জেদ করো কেন?'
' আপনি আমার ওপর এত অধিকার ফলাবেন না। আমি আপনার কেউ না। আপনাদের মত ছেলেদের আমি ঘৃণা করি।'
' কোথায় যাবে শুনি?'
' আপনাকে বলতে যাব কেন?'
' আরো ষোলো ঘন্টা বাকি আছে। এর আগে কোথাও যাবে না।'
মোহনাও দমে যায়। নীলাদ্র বলল,' চলো বাইরে ঘুরতে যাই।'
মোহনাও রাজি হয়ে যায়। তারা একটা ফুচকা দোকানে যায়। নীলাদ্র এসব পছন্দ করে না। তবুও মোহনার জন্য নিজেও খেতে বসল। এক পর্যায়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল,' আচ্ছা ভাই, আপনি এত কষ্ট করে রোজগার করেন কেন?'
দোকানদার মনে হলো কোনো জোকস শুনল, হেসে বলল,' কি কন ভাই? পোলা, মাইয়া আর বউয়ের লাইগ্গাই রোজগার করি। আর কি জীবনের মানে। বউ, পোলাপানের শান্তির জন্যই করি। তারা শান্তি থাকলেই আমি শান্তি।'
' বউকে খুব ভালোবাসেন?'
' হ ভাই। ভালোবাসা ছাড়া কি আর সংসার টিকে?'
মোহনা কিছু খাবে না বলে এখান থেকে ওঠে যায়। নীলাদ্র আর কাউকে জিজ্ঞেস করেনি কিছু। সারাদিন ঘোরাফেরা করে। মোহনাও নিজের মত উপভোগ করছে। যদিও ঠোঁটে এক চিলতেও হাসি নেই।
সন্ধ্যায় আসতেই নীলাদ্রর বাবার হার্টের ব্যথা শুরু হয়। তার মা কেঁদে একাকার। তাড়াতাড়ি হাসপাতাল নেওয়া হয়। মোহনা দেখল তার শশুর একটু ভালো হতেই শাশুড়ি ছুটে যায়। গ্লাসের ফাঁক দিয়ে মোহনা দেখল তার শশুর শাশুড়ির ভালোবাসা। তারা একে অপরকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
এমন সময় মোহনা সরে যেতেই দেখল তার পেছনে নীলাদ্র দাঁড়িয়ে আছে। নীলাদ্র ওকে উদ্দেশ্য করে বলল,' আমার শেষ প্রমাণ এটা। তবে একটু পর বলব, আগে বাবাকে বাড়ি নিই, এখন ওনি সুস্থ আছেন।'
রাত বারোটা বাজে। একটা বাজলেই তিনদিন শেষ হবে। মোহনা কোমর পর্যন্ত কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে আছে। নীলাদ্র ওর পাশে এসে বসল। সাথে সাথেই মোহনা ওঠে গেল। নীলাদ্র বলল,' আমার বাবা মা হলো আমার শেষ প্রমাণ। এরপর তোমার যা ইচ্ছা সিদ্ধান্ত।'
মোহনা কিছু বলল না। নীলাদ্র বলল,' মাকে যে সুস্থ দেখছ তা একমাত্র বাবার জন্যই!'
মোহনা অবাক হয়ে বলল,' মানে?'
' দু'মাস আগে মায়ের দুইটা কিডনিই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মৃ'ত্যু পথযাত্রী ছিল মা। আর তখন বাবা নিজের একটা কিডনি মাকে দিয়ে দেয়। তারা শপথ করেছিল বাঁচলে একসাথে বাঁচবে, মরলে একসাথে মরবে। তাইতো বাবা নিজের কিডনি দিতেও দ্বিধা করেনি। ভালোবাসার জন্য নিজের প্রাণ বললেও আমার বাবা মা একে অপরের জন্য দিতে রাজি।'
মোহনা বুঝতে পারছে না তার কি বলা উচিত। ভালোবাসা এমনও হয়? তা তার জানা ছিল না। সেতো স্বামী স্ত্রী মানেই জানতো তার বাবা মায়ের মত। যেখানে একজন পুরুষ অকথ্য অত্যা'চার করবে নারীর উপর। অন্যজন লোকল'জ্জার ভয়ে তার সাথে সংসার করে যাবে মুখ বুজে।
মোহনা পূর্ণ দৃষ্টি দিল নীলাদ্রের ওপর। এই তিনদিনে একবারও ভালো লাগার দৃষ্টিতে দেখেনি সে। আজ তাকাল। দেখেই কেমন ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। নীলাদ্র চোখে মুখে বিষন্নতা আর ভালোবাসা মেলে ধরে তাকিয়ে আছে।
মোহনা চোখ সরাতে গিয়েও সরায় না। দুজন দুজনকে প্রাণ ভরে দেখতে থাকে।
কিছু সময় যাওয়ার পর মোহনা বলল,' আপনি কি আমার বাবার মত নাকি আপনার বাবার মত?'
নীলাদ্র হেসে বলে,' আমি আমার মত। তুমি কি আমাকে গ্রহণ করবে? কথা দিলাম যে কষ্ট এতদিন বয়েছিলে তার সূচ পরিমাণও পেতে দেব না।'
' যদি আপনি পরিবর্তন হয়ে যান?'
' ওটা ভাবার কারণ নেই। যদিও আমি কখনো পরিবর্তন হব না তবুও তোমাকে আমি এমনভাবে গড়ে তুলব যেন নিজেকে তোমার অবলা মনে না হয়। তুমি পড়াশোনা করবে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। আমি হব তোমার শিক্ষক।তোমার মায়ের শিক্ষা নেই বলে সে অবহেলিত হয়েছে। তুমি সেটা হবে না। তুমি শিক্ষিত হবে, চাকরি করবে কিনা তোমার ব্যাপার। তবে নিজেকে তুমি এই সমাজের যোগ্য করে তুলবে।'
মোহনা একটু ভেবে বলল,' আমার ভাইয়ের পাশাপাশি আপনাকেও আমার ভালো লাগে।'
নীলাদ্রর চোখ ঝিলিক মেরে ওঠে। মোহনা বলেছিল তার ভাই ছাড়া আর কোনো পুরুষকেই সে কখনো দেখেনি ভালো করে। নীলাদ্রের ইচ্ছে করছিল মোহনাকে একবারের জন্য জড়িয়ে ধরে এই সময়টাকে স্মরণীয় করে রাখতে। কিন্তু সামলে নিয়ে বলল,' তোমার মায়ের কষ্ট পেতে হত না যদি শা'লা বাবু তোমার বড় হত। তুমিতো সবার মুরব্বি তাই না?'
মোহনা হেসে ওঠে। বলল,' জানেন, আমার ভাইটা না কখনো শুকনো ভাত খেতে পারে না। আজকে আপনি যখন রাস্তায় থাকা ছেলেটাকে খাবার দিলেন ভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ল।'
' কেন?'
' গত রমজানে বাবা কোনো টাকা দেয়নি আমাদের। বাবা ব্যবসার কাজে রমজান মাস বাইরে ছিল। এর আগে পরে কোনো টাকা দেয়নি আমাদের। অনেকদিন শুকনো ভাত খেতে হয়েছে। ঘরে চাল ছাড়া তেমন কিছু ছিল না। আমরাতো বড়লোক তাই হাত পাতা নিষেধ। রমজানের পনেরোদিন পর্যন্ত শুকনো ভাত খেয়ে রোজা রাখতে হয়েছে এরপর মামা জানতে পেরে খরচ পাঠিয়েছিল। বাবাকে অনেকবার কল করে বলেছিলাম কষ্ট হচ্ছে খুব। কিন্তু বাবা শুনেনি।'
নীলাদ্র বাকরুদ্ধ! এমন বাবাও আছে বুঝি? এত নিষ্ঠুর বাবাও হয়? হ্যাঁ হয়! আমাদের সমাজের আনাচে কানাচে এমন অনেক বাবা আছেন যারা নিজেদের দায়িত্ব ভুলে যায়। যারা স্ত্রী বলতে শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার খোরাক আর ব্যবহারের ঠুনকো জিনিস মনে করে। তারা কখনো ভালোবাসা বুঝে না। তারা বুঝে না প্রেমের গভীরতা।
মোহনার বুকের ভেতর জমানো কষ্টগুলো যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। নীলাদ্র তাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। কিন্তু বার বার হাত বাড়িয়েও সরিয়ে নিয়ে আসছে।
মোহনা নিজে থেকেই বলল,' আমার কষ্ট হচ্ছে, আমাকে জড়িয়ে ধরুন।'
নীলাদ্র এক ঝটকায় মোহনাকে বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। সাথে সাথেই মোহনা তাকে ধা'ক্কা মেরে খাট থেকে ফেলে দেয়। কোমরে ব্যথা পেয়ে নীলাদ্র বলল,' এমন করলে কেন?'
মোহনার শরীর কাঁপছিল। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,' আমার সুড়সুড়ি লাগছিল, আপনার শরীর খুব গরম আর...'
নীলাদ্র কোনরকমে ওঠে এসে বলল,' আর কি?'
' আমার জানা নেই। কিছু একটা...'
' সেটা কি? আমার স্পর্শ কি তোমার খারাপ লাগছিল?'
' উঁহু,, খারাপ লাগেনি তবে সহ্য হচ্ছিল না।'
'মানে?'
' আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল যেন। আপনি আমাকে আর কখনো ছুঁবেন না। মনে থাকে যেন।'
' এটা কেমন কথা। বিয়ে করেছি, বউকে ছুঁব না কেন?'
' এটা আমার আদেশ। গুড নাইট!'
বলতে না বলতেই মোহনা ঘুমিয়ে পড়েছে। নীলাদ্র নিজের চুল খামচে ধরে। বাপ্পারাজের পুরনো একটা গান প্লে করে শুনতে থাকে। খাটে থাকা মোহনার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,' আমার কি তাহলে বাসর হবে না?'
~ সমাপ্ত

0 মন্তব্যসমূহ