#মায়ামৃদঙ্গ

#সাথী_ইসলাম

#পর্ব_১

সোহানের বন্ধু তাকে কিছু ভিডিও আর ছবি পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করল,' কিরে, এটা তোর মেয়ে না?'

সোহান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে আরামে। নিজ কেবিনে আধঁশোয়া হয়ে বসা। মোবাইলটা হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে। পরক্ষণেই তার চোখজোড়া রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। ক্ষুধার্ত বাঘের মতো চিৎকার দিয়ে ওঠে। হনহন করে বেরিয়ে পড়ে। বেরোনোর সময় সমস্ত লোক তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছিল। সব উপেক্ষা করে বাড়িতে যায়। বিনা অনুমতিতে বড় মেয়ে সুহাসিনীর ঘরে প্রবেশ করে।

' এটা কি করলি তুই?'

সুহাসিনী চোখ মুছে বলল,' আমি কিছু করিনি বাবা।'

'এসব কি? কিভাবে এলো?'

' আমি জানি না। বিশ্বাস করো।'

'নষ্টা মেয়ে! আমার ভাবতে অবাক লাগছে যে তুই আমার মেয়ে। ছিঃ ছিঃ। ঘেন্না ধরে গেছে।' বলেই তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়িয়ে পায়ে গটগট আওয়াজ তুলে সোহান খন্দকার চলে যেতে উদ্যত হতেই সুহাসিনী তার পা জড়িয়ে ধরল।

' বিশ্বাস করো বাবা, ওই মেয়েটা আমি ন‌ই। আমি এটা কক্ষনোই করতে পারি না। জিবৎকালেও না। বিশ্বাস করো না গো আমায়। ওই... ওই ভিডিওটা আমার নয়। ওটা আমি ন‌ই বাবা.... ওটা আমি ন‌ই।'

' তোর ওই অলক্ষুনে মুখে এখনো কথা ফুটছে দেখে আমি অবাক হ‌ই। ভাবতে অবাক লাগছে এমন কুলা'ঙ্গার মেয়ে আমি জন্ম দিয়েছি।'

সুহাসিনী হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। কষ্টে তার বুকটা এই বুঝি ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ঠোঁট উল্টে কাঁদে। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু সোহানের পায়ে বিদ্ধ হতে থাকে। দ্বিগুণ উত্তেজনা নিয়ে সুহাসিনী উচ্চারণ করে,

' বাবাগো! কেন আমাকে এতো অবহেলা করছ? আমি তোমার মেয়ে হয়ে ভুল করিনি। কোনো অন্যায় করিনি আমি। ওই জঘন্য ছবি, ভিডিও আমার নয়। ওই মেয়েটা আমি হতে পারি না।'

' কল'ঙ্কিনী মেয়ে। তোর মুখ দেখাও হারাম। আমি তোকে আমার চোখের সামনে দেখতে চাই না। যে মেয়ে আমার সম্মানের কথা ভাবে নি, নষ্টামি করেছে, তার মুখোদর্শন করতে চাই না আমি। তোর মুখ দেখার আগে যেন আমার মৃ'ত্যু হয়। চাইনি দেখতে এই দাগ লাগা মেয়েকে।'

' না বাবা! এমন কথা বলো না মরে যাব আমি।' মুখ চেপে ধরে কাঁদে সুহাসিনী। এর‌ই মধ্যে দৌড়ে ঘরে ঢুকে শাওন। তার চোখে মুখে বিষাদের ছোঁয়া। সুহাসিনী ভাইকে দেখে পুনরাবৃত্তি করে,' ভাইয়া, বাবাকে বুঝাস না। ওই ছবিটা আমার নয়। আমি ন‌ই ওই মেয়েটা।'

শাওন কিছু না বলে সুহাসিনীকে মাটি থেকে তুলে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। তার অক্ষিযুগল থেকে অনবরত নোনা পানির স্রোত বেয়ে নামছে।

' কাঁদিস না বোন। আমি জানি এটা তুই না। বোকা মেয়ে, এভাবে কাঁদতে হয়? দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই এভাবে ভেঙ্গে পড়িস না তাহলেই হবে।' পরক্ষণেই সোহানের দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে, ' কেমন বাবা তুমি? কিভাবে এসব মিথ্যা বিশ্বাস করলে?'

ছেলের কথা শুনে কপট রাগ দেখিয়ে সোহান ওই স্থান ত্যাগ করে। রান্নাঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এলেন রেহনুমা। সুহাসিনী কে কাঁদতে দেখে প্রশ্ন ছুঁড়ে,' কি হয়েছে মেয়ের? ওভাবে কাঁদছে কেন?'

' কিছু হয়নি আম্মা! ওকে নিয়ে ঘরে যাও তুমি।' শাওন কথাটা যোগ করেই সুহাসিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। রেহনুমা মেয়েকে নিয়ে ভেতরে যায়। জিজ্ঞাস করে কি হয়েছে! না কিছুই বলছে না। শুধু কেঁদেই চলেছে। দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট পর বলল,' আম্মা! আমি মরে গেলেই তো আর কোনো সমস্যা র‌ইল না, তাই না?'

রেহনুমা আঁতকে ওঠে,' কি বলছিস এসব? কিছু হবে না তোর। একদম এসব কথা মুখেও আনবি না। '

' না, এটাই স্যলিউশান। আমি মরে গেলেই সব শান্ত হয়ে যাবে। তুমি বেড়িয়ে যাও এই ঘর থেকে। আমি একা থাকতে চাই।' বলেই দু'হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নেয়। রেহনুমা মেয়েকে ছেড়ে যেতে অনিচ্ছুক। সুহাসিনী জোর করে তাকে ঠেলে বের করে দেয় ঘর থেকে। সাথে সাথে ঘরের দরজা লাগিয়ে দেয়। আঁট করে সিটকিনি লাগিয়ে দেয়। বড়সড় একখানা চেয়ার টেনে এনে দরজার সামনে দিয়ে দেয়।

রেহনুমা অবস্থা নত দেখে শাওনকে কল করে। পাশাপাশি সোহানকে। কিন্তু সে এক কথায় বলে দেয়, 'এমন মেয়ে মরে গেলে আমি কিছুটা শান্তি পাই। ওর মুখ দেখতে চাই না আমি। '

শাওন দৌড়ে এসে দরজা ধাক্কায়। কিছুতেই খুলছে না। সুহাসিনী ফ্যানের সাথে ওঁড়না ঝুলিয়ে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিদায় নেবে এই পৃথিবী থেকে।

শাওন উপায় না পেয়ে জানালায় যায়। জানালা বন্ধ থাকায় কিছুই দেখতে পায় না। ইতিমধ্যে সুহাসিনী গলায় দড়ি পেঁচিয়ে নিয়েছে। চোখ বন্ধ করে আরেকবার প্রিয়জনদের কথা ভেবে নেয়। মনটা এখনো শান্ত হতে পারেনি। বার বার মায়ের ছবিটা চোখের সামনে আসছে। চোখের পানি আর বাঁধ মানছে না। শেষ বারের মতো মাকে, ভাইকে দেখার ইচ্ছা হচ্ছে তার, কিন্তু এখন সময় নেই। সুহাসিনী দ্রুত চেয়ারটা পা দিয়ে ফেলে দিল। 

শাওন মাত্র‌ই দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে। সুহাসিনীকে ঝুলে থাকা অবস্থায় কাতরাতে দেখে তাড়াতাড়ি পা জড়িয়ে ধরে। সযত্নে নিচে নামিয়ে আনে। অজ্ঞান হয়ে আছে সুহাসিনী।

রাতে জ্ঞান ফিরে সুহাসিনীর। রেহনুমা এসে খাবার খাইয়ে দেন জোর করে। রাতটা সুহাসিনীর সাথে থাকতে বলেন, কিন্তু সুহাসিনী রাজি হয় না। তার কথা, সে একা থাকতে পারবে। 

শাওন ঘরে বসে অঝোরে কাঁদছে। বোনের চেয়েও যেন তার দুঃখের পরিমানটা বেশি। রেহনুমা কিছুতেই মেয়েকে একা ছাড়তে চায় না। রাত একটু গভীর হতেই তিনি একপ্রকার জোর করেই সুহাসিনীর সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। সুহাসিনীও ঘুমের ভান ধরে শুয়ে থাকে। 

রাত গভীর হতেই সুহাসিনী ওঠে পড়ে। এই দীর্ঘ সময়ে তার চোখে বিন্দুমাত্র ঘুম আসেনি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। এখন পরিপাটি হচ্ছে নতুন গন্তব্যের জন্য। যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবে। এই কলুষিত সমাজে থাকা মানে আরো অপমানিত হ‌ওয়া। অসম্মান বয়ে আনবে পরিবারের জন্য আরো বেশি। 

জানালায় ওঁড়না ঝুলিয়ে সুহাসিনী বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এলোমেলো পা ফেলে হাঁটতে থাকে রাস্তায়। প্রায় ত্রিশ মিনিট হাঁটার পর ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে মাঝ রাস্তায়। কাঁদছে চিৎকার করে। চিৎকারের শব্দে যেন আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠল।

ইন্সপেক্টর রুদ্রের ডিউটি শেষে ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে গেছে। খুব দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছিল। হঠাৎ মাঝ রাস্তায় সুহাসিনীকে কাঁদতে দেখে ব্রেক কষে। ইতিমধ্যে সুহাসিনী অজ্ঞান হয়ে গেছে। রুদ্র তাকে জাগানোর চেষ্টা করে অসফল হয়। পরক্ষণেই কোনোকিছু না ভেবে সুহাসিনীকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে গাড়িতে শুইয়ে দেয়। দীর্ঘ পথ শেষে নিজের বাড়িতে পৌঁছায়। চাকরীর সুবাদে একাই একটা বাংলোতে থাকে রুদ্র। সুহাসিনীর চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে দিলেই সে জেগে ওঠে। চোখ কচলে বোঝার চেষ্টা করে, সে কোথায় আছে।

 রুদ্র ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সুহাসিনীকে জাগ্রত অবস্থায় দেখে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ে। চুলে হাত বুলিয়ে খাটের এক পাশে এসে বসে। সুহাসিনী আড়চোখে দেখে, কিন্তু কোনো ভাবগতি নেই তার মধ্যে। রুদ্র আগ বাড়িয়ে বলল,' আমাকে ভয় পাচ্ছেন না?'

সুহাসিনী মৃদু হেসে বলল,' তা কেন?'

রুদ্র আরো অবাক হয়ে বলল,' আমি আপনার কাছে অপরিচিত একজন ব্যক্তি, আমিতো আপনার ক্ষতি করতেও পারি, তাই ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক না।'

সুহাসিনী তাচ্ছিল্যের সহিত বলে,' ক্ষতি? আর কি ক্ষতি বাকি আছে? আমারতো সব শেষ, ভয় করে কি করব? এখন যে শুধু মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া বাকি!'

রুদ্র বুঝতে পারছে না কিভাবে মেয়েটা এখনো নিশ্চিন্তে বসে আছে। তার কেন ভয় করছে না? তার জীবনে কি এমন ঘটেছে, যার জন্য সে মৃ'ত্যু চায়। সব জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে সে। কিন্তু অসুস্থ মেয়েটাকে সে বিভ্রান্ত করতে চায় না। তাই ওঠে রান্নাঘরে যায়। কিছু খাবার নিয়ে আবার ফিরে আসে। 

'আমার মনে হয় আপনার এখন কিছু খাওয়া উচিত।' বলল রুদ্র।

 সুহাসিনী অমত না করে খেয়ে নেয়। খাওয়া শেষে রুদ্র বলে,' আপনি কি আমাকে বলতে চাইবেন, আপনার সাথে ঠিক কি ঘটেছিল?'

' বিশ্বাস হবে তো?'

' কেন হবে না? আপনি কি মিথ্যা বলবেন নাকি? আমার তা মনে হয় না। অচেনা কাউকে মিথ্যে বলে লাভ নেই, সত্যি বললে মনটা হালকা লাগবে। বন্ধু ভেবেই বলতে পারেন।'

'তাহলে শুনুন।'

' এক মিনিট!'

সুহাসিনী অবাক দৃষ্টিতে তাকায় রুদ্রর দিকে। রুদ্র মৃদু হেঁসে বলল,' আগে তো নামটা বলুন। আমি রুদ্র মজুমদার। আর আপনার নাম?'

' সুহাসিনী... সুহাসিনী সিদ্দিকী...!'

______________________________________________

সিদ্দিকী নিকেতন,

লবঙ্গপুরের পূর্বে অবস্থিত বিশাল রাজবাড়িটির মালিক সোহান সিদ্দিকী। ব্যবসার সুবাদে অনেক কিছুই জোড়ানো হয়েছে। তবে অনেকটা কৃপণ স্বভাবের লোক তিনি। কিছুতেই দু'টাকা খসে না তার হাত থেকে। এইতো সেদিন মেজো মেয়ে সৃজিতা কান্নাকাটি করেও স্কুলের ফি নিতে পারে নি। ঘরে তার স্ত্রী রেহনুমার নাজেহাল অবস্থা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে। ছোট মেয়েটার দিকে তো কারো নজর‌ই পড়ে না। বয়স মাত্র পাঁচ বছর। তাই অতশত আবদার নেই। অথচ ঘরের এই বিষাক্ত পরিস্থিতির কথা আর কেউ অবগত নয়। 

সকাল সকাল বাড়ি মাথায় তুলেছে সোহান। রেহনুমা ঘরের যাবতীয় কাজ সামাল দিয়ে মাত্র‌ই বেরোলো। সোহানের চিৎকার কানে আসতেই কেঁপে ওঠে।

' আমার গরম পানি কোথায়?'

সোহানের উক্তিতে তার ছোট মেয়ে শ্রেয়া কেঁদে ওঠে। বিছানা থেকে ওঠে চোখ কচলে কান্না করে। সৃজিতা তার মুখে হাত চেপে ধরে আছে।

' একদম চুপ! না হয় বাবা রাগ দেখাবে আবার।' 

পাশ থেকে সুহাসিনী শ্রেয়াকে সৃজিতার কবল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আদর করে। ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটার প্রতিও কেন যে সোহান সিদ্দিকীর মায়া হয় না তা আদৌ জানা যায় নি। সুহাসিনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোনকে বুকে জড়িয়ে নেয়।

রেহনুমা তাড়াতাড়ি গরম পানি দিয়ে আসে সোহানকে। গোসল সেরে সোহান বের হবে। অবশ্য কোথায় যাবে সেটা অজানা ঘরের প্রতিটি সদস্যের।

শাওন ঘুমাচ্ছে। সকালের এমন বিকট আওয়াজ প্রতিদিনকার ব্যাপার। কানে বালিশ গুঁজে বেঘোরে মরার মতো পড়ে থাকে সে। রেহনুমা গিয়ে চা দিয়ে আসে। কয়েকবার ডাক দেয়। এই ছেলে যেন কুম্বকর্ণ। কিছুতেই তার ঘুম সরে না। তাকে যদি বলা হয় সারাজীবন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে। তাহলে সে সেটাও পারবে। নিচ থেকে চিৎকার ভেসে আসে কারোর। রেহনুমা মৃদু হেসে ছেলের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। 

মালিহা ডাকছে চায়ের জন্য। রেহনুমাকে দেখে বলল,' মামি! এতো বেলা হয়ে গেল, এখনো কেন আমার চা পাঠান নি?'

রেহনুমা কিঞ্চিত হাসার চেষ্টা করে বলে,' এইতো, আমি এখনই যেতাম। তুমি ঘরে যাও। আমি এখুনি চা নিয়ে আসছি।'

' থাক, আর লাগবে না। আমি নিজেই নিয়ে যাচ্ছি। এ বাড়িতেতো আর নিয়ম করে কিছু পাওয়া যায় না। হুহ্!' বলেই  মুখ বাঁকিয়ে রান্না ঘরে পাড়ি জমায় মালিহা। পেছন থেকে গলা বাড়িয়ে দেন আলেয়া। মেয়ের সাথে সুর মিলিয়ে রান্নাঘরে যান। 

আলেয়া সোহানের বড় বোন। পৃথিবীতে যত খারাপ গুনাবলী আছে তা মনে হয় আলেয়ার মধ্যে বিদ্যমান। দুটো মেয়ের একটাকেও ভালো শিক্ষা দেয় নি। মালিহা হয়েছে ঠিক তার স্বভাবের।

সকাল আটটা ছুঁই ছুঁই। বাড়ির প্রতিটি সদস্য ফ্রেস হয়ে খাবার টেবিলে জড়ো হলো। সৃজিতা আর শ্রেয়া কখনো একসাথে বসে না। নির্ঘাত ঝগড়া বাঁধিয়ে দেবে। তাই দুজনকে আলাদা রাখতে হয়। শাওন, সোহান পাশাপাশি বসেছে। শাওনের অন্য পাশে শ্রেয়া। সুহাসিনী রেহনুমাকে হাতে হাতে সাহায্য করছে। অথচ বাড়িতে আরো দু'জন সদস্য আছে যারা কোনো কাজ করে না। আলেয়া নিজে কখনো রান্নাঘরে আসে না। মালিহাও কখনো রেহনুমাকে সাহায্য করে না। অথচ সবাই মিলে কোনো কাজ করলে অনায়াসেই সেটা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। 

সবাই খাবার খাচ্ছে। এমন সময় রেহনুমা সুহাসিনীকেও টেবিলে বসে যেতে বলে। কিন্তু সে বসে না। মৃদু হেসে বলে,' না আম্মা, আমি তোমার সাথে খাব।'

আলেয়া খাওয়ার ফাঁকে বলে উঠে,' মা মেয়েতো একজোট তাই। পরে খেলেই ভালো হয়। বেশি খেতে পারবে।'

সুহাসিনী জবাব দিতে যাবে এমন সময় রেহনুমা চোখ রাঙায়। অশান্তি চায় না রেহনুমা। সে যাই হোক। সোহান আপনমনে খাচ্ছে। একবারও সুহাসিনীকে খেতে ডাকল না। সামনে দাঁড়িয়ে আছে দেখেও একটিবার বসতে বলল না। বাবা বুঝি এতোটাও নিষ্ঠুর হয়। তা জানা ছিল না সুহাসিনীর। তবুও বাবার প্রতি তার বিন্দুমাত্র রাগ নেই। খুব ভালোবাসে বাবাকে।

মেয়েরা স্বভাবসুলভ বাবার প্রতি আসক্ত। ভালোবাসা বেশি থাকে বাবার প্রতি। অথচ সে ভালোবাসা বুঝে না সোহান সিদ্দিকী। ছোট থেকেই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে মেয়েদের। এমন নয় যে তিনি ছেলেকে পছন্দ করেন। তাও নয়। ছেলেটা যেন তার দু'চোখের বিষ। রেহনুমা ভাবতে থাকেন পুরনো দিনগুলোর কথা। বাবার বাড়ির রাজকন্যা ছিলেন যখন। কত‌ইনা আদর করত তার বাবা তাকে। কিন্তু তার ছেলে মেয়েরা বাবার আদর পাচ্ছে না। মনটা না চাইতেই কেঁদে ওঠে। 

স্বভাবসুলভ মিশুক স্বভাবের মেয়ে সুহাসিনী। জন্মের পর তাকে তার দাদির কোলে দেওয়া হয়। দাদিমার কোলে গিয়েই সে লাজুক হাসে। ভুবণমোহিনী সে হাসিতে আটকা পড়ে তার দাদি তার নামকরণ করে ' সুহাসিনী '। সেই হাসি এখনো অক্ষুন্ন রয়েছে। শত কষ্টে কেমন বোকার মতো হাসে মেয়েটি। হাসি দিয়ে সবাইকে বোঝাতে সক্ষম, সে কষ্ট পায় নি। অথচ দরজার আড়ালে তার ক্রন্দন হয় ভয়ঙ্কর।

দশটা নাগাদ স্কুলে হাজির হয়। বাড়ি থেকে নিয়ে আসা বিষন্ন মনটাকে হাসিখুশি করে নেয় মুহূর্তেই। দশম শ্রেণির নবাগত শিক্ষার্থী সুহাসিনী। পড়াশোনায় যেমন কাজে-কর্মে তার দশগুণ। ভুবনমোহিনী রূপ তাঁর। এক দেখাতেই যে কেউ তার রূপে মুগ্ধ হতে বাধ্য। এই রূপ‌ই হয়ত কাল হয়ে দাঁড়াবে। রেহনুমা চিন্তায় থাকেন মেয়েদের নিয়ে।

সোহান রাত দশটার পর বাড়িতে আসে। হাতে তার একটি বাক্স। সুহাসিনীকে ডাকেন। সুহাসিনী আসা মাত্র‌ই তার হাতে একটি বাক্সটি ধরিয়ে দেয়। কি আছে জানতে চাইলে তিনি কিছুই বলেন না। রেহনুমা অবাক না হয়ে পারল না। কখনো তো সোহান মেয়েদের জন্য কিছু আনেন না। আজ হঠাৎ কি নিয়ে আসলেন, তা নিয়ে সন্দেহ প্রখর হয় রেহনুমার। সুহাসিনী গোল গোল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরে চলে যায়। 

হাতে বাক্স দেখে সৃজিতা কৌতুহল নিয়ে হাজির হয় সুহাসিনীর কাছে। 

' আপু, কি আছে এতে?'

' জানি না। বাবা দিয়েছে, কি আছে এখনো দেখিনি।'

' বাহ, ভালো তো। বাবাতো আমাদের কিছু দেয় না তাই ভালো কিছু আশা করতে পারি না।'

সুহাসিনী কিঞ্চিত রাগ নিয়ে বলে,' এভাবে বলছিস কেন? বাবা দেয় না তো কে দেয় আমাদের? বাবা আছে বলেই কেউ আমাদের সাথে কথা বলতেও ভয় পায়। বাবা না থাকলে দেখতি আমাদের কেমন নাজেহাল অবস্থা হত।'

' আচ্ছা ঠিক আছে। আমারতো আর তোর মতো এত যুক্তিযুক্ত একটা মাথা নেই, তাই বুঝতে পারি না।' বলেই ফিক করে হেসে ফেলে সৃজিতা।

দু'বোন মিলে ভীষণ কৌতুহল ও আনন্দের সাথে রেপিং খোলে।


চলবে....