#ছায়া_মানব

#সাথী_ইসলাম 

৭৯.

মোড়ল বাড়িতে হুলস্থুল কান্ড। ব‌উ পালিয়েছে বিষয়টা সবার কানে যেতেই কানাকানি শুরু হয়। মোড়ল আর স্থির থাকতে পারল না। আরিশকে ডেকে নেয় নিজের ঘরে। কিছুক্ষণ স্থির থেকেই আরিশকে কষে চ'ড় মারল।

আরিশ বিরতিহীন তাকিয়ে থাকে মোড়লের দিকে। এই প্রথম বাবা তার গায়ে হাত তুলেছে। তার বিশ্বাস হচ্ছিল না বাবার এই রুপ। ঠোঁট নড়ে ওঠে আরিশের। কান্না করতে ইচ্ছে করছিল। মোড়ল ঝাঁঝালো কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে,' সব জানতি তুই তাই না? কেন আগে বললি না?'

আরিশ কান্না করেই দেয়। এতক্ষণ জমিয়ে রেখেছিল কান্না সব। এখন ভেতর থেকে সবটা বেরিয়ে আসে। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে। আচমকা মোড়লকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। মোড়ল কিছুই বুঝতে পারে না। সেও আরিশের পিঠে চাপড় দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে।

আরিশ বলল,' বাবা, তুমিইতো বলেছিলে ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়া জরুরী। তাহলে কেন আজ তার বিরোধিতা করছ?'

' আমি তোর কথা বুঝতে পারছি না। কি হয়েছে বল আমাকে? সত্যিটা বল।'

' বাবা, আমার আগেই অহনার জীবনে আর্মি অফিসার মাহতিম ছিল। তারা দুজন দুজনকে ভালবাসে খুব। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমিও ভালোবেসেছি অহনাকে কিন্তু সে বাসেনি। তুমিই বলো বাবা, আমি কি করে তাদের আলাদা করি? আমি অনেক চেষ্টা করেছি তাদের মেলানোর, কিন্তু সম্ভব হয়নি। প্রকৃতি তার বিরোধিতা করেছে। মাহতিমকে মেরে ফেলেছে। অহনা এখনো তাকে ভুলতে পারেনি। আমি কি করে তার মন পাব? এটা কখনোই সম্ভব না। আমি কি করব এখন বলে দাও?'

মোড়লের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সমস্তটা জেনে তিনি কি বলবেন বুঝতে পারলেন না। কি বলে ছেলেকে সান্ত্বনা দেবেন, তেমন ভাষা তার কাছে সঞ্চিত নেই।

মোড়ল ছেলের হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে আসে। আয়শার সাথে শলা পরামর্শ করে কিছুক্ষণ। তারপর লাবণীর মা রাভিনাকে ডেকে বলল,' আপা, আপনার মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ে দিতে চাই এই আসরেই, আপনি কি রাজি?'

রাভিনা বলল,' এই সময় এটা কিভাবে মেনে নিই? সম্ভব না। তবে লাবণী যদি রাজি থাকে তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি আমার মেয়ের সম্মতিই মেনে নেব।'

মোড়ল লাবণীকে বলতে যেতেই আরিশ বাঁধা দেয়,' না বাবা, আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয় লাবণীকে বিয়ে করা। আমি একজনকেই ভালোবেসেছি আর তাকেই চাই। অহনাকে বিয়ে করব আমি, না হয় আর কখনোই বিয়ে নামক বন্ধনে যাব না। দয়া করে আমাকে জোর করো না। এমনিতেও আমি ভালো নেই। কষ্ট হচ্ছে আমার।'

আরিশ দপাদপ পা ফেলে বেরিয়ে যায়। লাবণী মুখ লুকিয়ে চলে যায়। পুরো বাড়িতে যেন অশান্তি নেমে আসে। কারো মুখে হাসি নেই। বিয়ে বাড়ির আমেজটাও নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আয়শা সব সামলে নেয়। মতি এবং রুমির সব নিয়মের ব্যবস্থা করে।

অহনা দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে মাহতিমকে। হৃদয়ের ব্যকুলতা আবারো প্রখর হয় মাহতিমের মনে। অহনার স্পর্শে তার শরীর জ্বালা করতে থাকে। খেয়াল করে দেখল হাতের কিছুটা অংশ হাওয়ায় মিশে গেছে। অহনা সেটা খেয়াল করে আঁতকে উঠে। ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠে,' তোমার কিচ্ছু হবে না মাহতিম। আমি এসে গেছি।'

অহনার কান্না দেখে মাহতিম নিজেকে আঁটকে রাখতে পারল না। বুকের ভেতরটা চিঁড়ে যাচ্ছে। অনর্গল অশ্রু বেয়ে নামছে চোখজোড়া থেকে। কিন্তু কি করবে সে? তাকে যেতেই হবে। সে চলে গেলেই সব শান্ত হয়ে যাবে। আর কিছুক্ষণেই তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। আর কখনো হয়তো অহনার সাথে দেখা হবে না। পৃথিবীর আলো বাতাস দেখা হবে না। অহনা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাহতিমকে। অহনার ধা'রালো স্পর্শে মাহতিমের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। তীব্র থেকে তীব্রতর যন্ত্রণা হতে থাকে। মনে হচ্ছে হাজারো খাদকেরা তার শরীর খুবলে খুবলে খাচ্ছে। মাহতিম সহ্য করতে পারছে না। ব্যথায়, বিচ্ছেদের কষ্টে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে চিৎকার দেয়। 

অহনা দু'হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বলল,' তুমি যেও না। চলো আমরা পালিয়ে যাই। আমরা সমুদ্রের পাড়ে থাকব নিরালায়।'

মাহতিম অহনার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। এই নিষ্পাপ চাহনি তাকে ভেতর থেকে আরো পঙ্গু করে দেয়। দু হাতে অহনাকে চেপে ধরে,' আমি চাই না যেতে। আমি তোমার সাথেই আজীবন থাকতে চাই। দেখো, এই প্রকৃতিটাও আমার পক্ষে নেই। একমাত্র তুমি ছাড়া এই পৃথিবীর আর কিছু আমার পক্ষে নেই। সবাই আমাকে চলে যেতে বলছে। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। আমি তোমায় ছাড়া কি করে যাই? আমি পারছি না। আমার সহ্য হচ্ছে না এত কষ্ট।'

মাহতিম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। শরীরে তার আর কোনো শক্তি নেই। নিজেকে সে সামলাতে পারছে না। আর এক কদম‌‌ও দিতে পারবে না। অহনা মাহতিমের বুকে হাত রাখে। ছ্যাঁত করে উঠে তার বুক। ব্যথাটা আরো বেড়ে যাচ্ছে।

মাহতিম ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠে,' এই ব্যথা থেকে আমাকে মুক্তি দাও। আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।'

অহনা চারিদিকে তাকায়। কি করবে এই মুহূর্তে? কিছুই সে খুঁজে পাচ্ছে না। ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছে নিজেকে।

মাহতিমের শরীর ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। 

অহনা উন্মাদ হয়ে যায়। কিছুই করার মত পাচ্ছেনা সে। মাহতিমকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে,' তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না? আমি কি করব এখন? আমি যে ব্যর্থ। আমি পারছি না নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে বাঁচাতে।'

আরিশ অহনাকে খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির পাশের বাগানে আসে। পরিত্যক্ত জায়গাটা। দূরে অহনাকে দেখে সে এগিয়ে যায়। কিছুটা গিয়েই থমকে দাঁড়ায়। মাহতিম আর বেশিক্ষণ নেই। তাই এই মুহূর্তে না গিয়ে সে দূর থেকেই বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করে। সে কিছুই করতে পারবে না। 

মাহতিম আরো নেতিয়ে পড়ে। কথাও বের হচ্ছে না মুখ থেকে। শীতল শরীরটা আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অহনা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মাহতিম এত কষ্টের মাঝেও হাসে। ঘনঘন শ্বাস নেয়। একবার থেমে গিয়েও আবার শ্বাস চলে। মাহতিম অনেক কষ্টে বলল,' আমি খুব খুশি। আমি শেষ সময়টাতে তোমার সাথে আছি। সময়টা আরো দীর্ঘ হলে হয়তো তোমার বুকে মাথা রেখে আমার মৃ'ত্যুটা হত না। আমি জয়ী প্রেমিক। জয় করতে পেরেছি তোমাকে। আমার আর কোনো আফসোস নেই।'

' এভাবে বলোনা।'

অহনা চারপাশে তাকিয়ে দেখে, সুনসান সবকিছু। কেউ নেই সাহায্য করার মত। এখন তার মনেও জানা হয়ে গেছে মাহতিম আর বেশিক্ষণ নেই।

মাহতিম বলল,' একটু হাসো। হাসলে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগে।'

অহনা কান্নামাখা ঠোঁটজোড়ায় হাসির রেখা টানে। পারছে না সে। তবুও মিথ্যে হাসি দেয়। মাহতিম প্রশান্তিতে চোখ বুঁজে। গাঢ় নিঃশ্বাস নেয়,' আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি! হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসি।'

মাহতিম পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়। অবশিষ্ট কাপড় আঁকড়ে ধরে থাকে অহনা। চিৎকার করে কাঁদে সে। কাপড়গুলো বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে গগনবিদারী ধ্বনিতে আর্তনাদ করে। বুকের ভেতরটা কষ্টে পুড়ে যাচ্ছে। কিভাবে সহ্য করবে এই কষ্ট? ভালোবাসা হারানোর এই আর্তনাদ অম্বরে প্রতিধ্বনিত হয়‌।

 অহনা উদাসীন হয়ে যায়। মাহতিমকে হারিয়ে নিজেও ম'রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গায়ের সমস্ত গয়না খুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলে। উন্মাদের মত হাতের কাঁচের চুড়ি খান খান করে ভেঙ্গে ফেলে। সেগুলো দিয়ে নিজেকে আ'ঘাত করতে থাকে অনবরত।

আরিশ দ্রুত গতিতে এসে অহনার হাত থেকে চুড়ির ভাঙ্গা টুকরো সব ফেলে দেয়। তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। অহনা থামে না। ঘর্মাক্ত দেহটা ভিজে একাকার। হাত থেকে র'ক্ত পড়ছে।

আরিশ ওকে উঠানোর চেষ্টা করে। অহনার এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দেয়,

' মাহতিম আর আসবে না। কিন্তু তোমাকে তার জন্য ভালো থাকতে হবে। তাহলে সে কষ্ট পাবে। তোমাকে কষ্ট পেতে দেখলে তার আরও বেশি কষ্ট হবে।'

অহনা দূরে তাকিয়ে হাসে,' ঐ দেখুন, মাহতিম আসছে। আমি জানতাম ও আসবে। আমাকে ছাড়া থাকতেই পারবে না। ছাড়ুন আমাকে, আমি মাহতিমের কাছে যাব।'

আরিশ সূক্ষ্ম নজরে দেখে,' ক‌ই, আমিতো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তুমি ভুল দেখছ, মাহতিম নেই।'

' আসছে ও, আমার কাছেই আসছে।'

অহনা দৌড়ে গিয়ে মাহতিমকে ধরতে যায়। মরীচিকার মত মিলিয়ে যায় মাহতিমের প্রতিবিম্ব। অহনা আবারো কেঁদে উঠে,' আবারো চলে গেলে? আমাকে কষ্ট দিতে তোমার খুব ভালো লাগে তাই না। খুব বাজে তুমি।'

অহনা আবারো বলে,' এইতো আমার সামনেই তুমি। এবার আর ছাড়ব না। কোথাও যেতে পারবে না।'

আরিশ অহনাকে সরাতে পারে না ঐ জায়গা থেকে। সে চারিদিকে মাহতিমকে দেখতে পাচ্ছে। হ্যালুসিনেশন হচ্ছে অহনার।

অহনার চোখ দুটো নিশ্চল হয়ে আসে। আরিশের কোলে ঢলে পড়ে। জ্ঞান হারিয়েছে!

আরিশ পাঁজাকোলে করে নেয় অহনাকে। নিস্তেজ দেহটাকে নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।


চলবে....