#ছায়া_মানব
৭৮.
অহনা, আরিশ পাশাপাশি বসে আছে। অহনা হাঁসফাঁস করছে। চারিদিকে দেখছে শুধু। মাহতিম কখন আসবে! আরিশ মহাখুশি। সে কাজীকে বিয়ে পড়াতে বলল। অহনা আঁতকে উঠে,
সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। আরিশ অহনার কাছ ঘেঁষে বলল,' তোমার কি সমস্যা হচ্ছে?'
অহনা গরম চোখে তাকায় আরিশের দিকে। মুহুর্তে চোখ নামিয়ে ফেলে আরিশ। অহনা বলল,' আপনি কিছু করুন। থামান এই বিয়ে। মাহতিম এখনো আসেনি।'
' সে আসবে না।'
অহনার নাকের পাটা লাল হয়ে আসে,' আপনি বন্ধ করুন। না হয় আমি এখান থেকে উঠে যাব এখন।'
আরিশ চুপ করে থাকে। কি করবে এখন? কোনো উপায় না পেয়ে বলল,' আমি চাই মতির বিয়েটা আগে হোক। ভাইয়ের পর আমি করব।'
মোড়ল বলল,' হঠাৎ এমন কথা কেন?'
' বাবা আমার ইচ্ছে ছিল আমি মতির পরেই বিয়ের নিয়ম মানব।'
' আচ্ছা, কোনো ব্যাপার না। তোমার যা ইচ্ছা।'
এমন অদ্ভুত ইচ্ছে জেনে মোড়লসহ বাকিদেরও কিছুটা ভাবনা হয়।
মাহতিম ছুটে আসে অহনার কাছে। কিন্তু বিবেক তাকে বাঁধা দিচ্ছে। সে আড়াল থেকে অহনাকে দেখে। কাছে যেতে চায় না। চোখ বেয়ে নোনা পানির স্রোত বেয়ে নামছে।
রুমি আর মতির বিয়ে হয়ে যায়। অহনা হাঁসফাঁস করতে থাকে। এখনো মাহতিম আসেনি। চোখের কার্নিশে পানি জমা হয়। হন্যি হয়ে খুঁজছে মাহতিমকে। কিন্তু কোথাও দেখতে পাচ্ছে না। বুকটা ধ্বক করে ওঠে অহনার। কেন আসছে না? কোথায় আছে? হাজারো প্রশ্ন নিয়ে মাথাটা ধরে আসে।
কাজী অহনা আর আরিশের বিয়ে পড়াতে আসলে আরিশ শুরু করতে বলে। অহনা অবাক হয়ে যায়। আরিশ কোন বাঁধা দিচ্ছে না। অহনার কলিজা কেঁপে উঠল। সে সোজা উঠে দাঁড়ায়। গটগট করে বিয়ের আসর থেকে চলে যেতেই আয়শা সামনে এসে দাঁড়ায়,' কোথায় যাচ্ছ এভাবে? বিয়ে এখনো শেষ হয়নি।'
অহনা আয়শার দিকে নজর না দিয়েই নিজের ঘরে চলে যায়। আরিশ উঠে পড়ে। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,' অহনা ওয়াশরুমে যাবে আমাকে বলেছিল। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ওকে নিয়ে আসছি।'
আরিশ মৃদু হেসে অহনার কাছে চলে যায়। সবাই তাদের এমন আচরণে ক্রুদ্ধ হয়েছে খুব। মোড়ল হাতের লাঠিটা নামিয়ে আসর থেকে উঠে চলে যায়। বর বউয়ের এমন উধাও হওয়ার বিষয়টা কারো হজম হচ্ছে না। অহনার সমস্যা হলে সে অনায়াসেই বলতে পারত। কিন্তু এভাবে বিয়ের আসর থেকে কিছু না বলে উঠে যাওয়াকে কেউ ভালো চোখে নিল না। সকলের মাঝে কানাকানি শুরু হয়।
অহনা নিজের ঘরে গিয়ে হন্যি হয়ে মাহতিমকে খুঁজে। সমস্ত জায়গায়। ঘরের সব উল্টে ফেলে দেয়। কোথাও পাচ্ছে না মাহতিমকে।
আরিশ অহনার ঘরে প্রবেশ করে। অহনাকে সে প্রচুর ভয় পায়। সাহস করে কিছুই বলতে পারছিল না এত সময় যাওয়ার পরেও। এভাবে তাকে উত্তেজিত দেখে আর সামলাতে পারল না। সত্যিটা বললে সে হয়তো কখনোই বিয়ে করতে চাইবে না। কিন্তু না বললে করবে এটাও মানা যায় না।
আরিশ অহনাকে সামলানোর জন্য তার দুই কাঁধ স্পর্শ করে শান্ত করার চেষ্টা করে। অহনা এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দেয়। আরিশ পুনরায় তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করে,
' এমন করো না। মাহতিম আর আসবে না।'
অহনা ফুলদানি ছুঁড়ে মারে আরিশকে,
' ও আসবেই। আমাকে কথা দিয়েছিল। ওকে আসতেই হবে।'
' আসবে না। আর কখনোই ফিরে আসবে না। এটাই তার ভাগ্যের লিখন ছিল। তুমি শান্ত হও। আমি সবটা বুঝিয়ে বলছি তোমাকে।'
' আমি কিছু শুনতে চাইনা। আমার মাহতিমকে এনে দিন আপনি। ওকে পেলেই আমি শান্ত হয়ে যাব।'
' ওনি ইভিল স্পিরিটের ব্যবহার করেননি।'
অহনা আঁতকে উঠে। অশ্রুসজল চোখে আরিশের মুখপানে দেখে,' মানে?'
' ওনি প্রকৃতির বিরোধীতা করে ইভিল স্পিরিটের ব্যবহার করেনি। তুমি বোকা, তাই বলেছ তাকে এটা করতে। কিন্তু তুমি তার পরিণতি জানতে না।'
' কিছু হত না। আপনি মিথ্যে বলছেন। আপনি সবটা জানতেন, তবুও কেন বললেন না কিছু?'
অহনা আরিশের কলার চেপে ধরে,
' আপনি সবটা প্ল্যান করে করেছেন তাই না? আপনি প্রথম থেকেই মাহতিমকে সহ্য করতে পারতেন না। তাই তাকে ভুলভাল বুঝিয়ে আমার থেকে আলাদা করার চেষ্টা করেছেন তাই না? আমি আপনাকে ছাড়ব না।'
' পাগলামো করো না। এটাই সত্যি! ইভিল স্পিরিটের ব্যবহার সাধারণ কেউ করে না। খারাপ লোকদের কাজ এটা। এই শক্তি ব্যবহার করে তারা অন্যের ক্ষতি করে, এটা আমাদের সমাজের অহরহ সমস্যার মধ্যে একটি।'
' আমি এত কিছু শুনতে চাইনি। আমি শুধু মাহতিমকে পেতে চাই। সেটা যেভাবেই হোক।'
' আমি তোমাকে কিভাবে বোঝাই! যদি সে ইভিল স্পিরিটের দ্বারা প্রাণ ফিরে পেত তাহলে তার শরীরে শয়তানি আ'ত্মা ভর করত। তখন সে নিজেই হয়তো পৃথিবী ধ্বংস করার জন্য নেমে পড়ত। যদি তার মধ্যে শয়তানি সে প্রাণ ফিরে আসত তাহলে সে হয়তো তোমার জন্য স্পেশাল হত, কিন্তু দুনিয়ার জন্য হুমকি হয়ে যেত। আবার এটাও হত, সে পুরোপুরি তোমাকে ভুলে যেত।'
অহনা আরিশকে ধাক্কা দেয়। একদম উন্মাদ হয়ে গেছে সে। কিছুই শুনতে নারাজ। চিৎকার করে মাহতিমকে ডাকে।
' আপনি আমাকে ভালোবাসেন তাই না? তাহলে আমার জন্য মাহতিমকে এনে দিন। আমি ওকে ছাড়া পাগল হয়ে যাব। সব শেষ করে দেব। আমার মাহতিমকে এনে দিন আপনি।'
অহনা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে ফ্লোরে। ডুকরে কেঁদে ওঠে,
' আমি এখন কোথায় খুঁজব তোমাকে মাহতিম? তুমি আমাকে না বলে কোথায় চলে গেলে? আমার দম আটকে আসছে। দয়া করে আমার কাছে আসো।'
আরিশ অহনার কাঁধে হাত রাখতেই অহনা ছ্যাঁত করে ওঠে,
' ছুঁবেন না আপনি আমাকে। সব আপনার পরিকল্পনা। আপনি ইচ্ছে করে এমনটা করেছেন। ভেবেছেন মাহতিম চলে গেলে আমি আপনাকে বিয়ে করব, কারণ আপনি আমাকে অসহায় মনে করেন। কান খুলে শুনে রাখুন, আমি অসহায় নই। আমার মাহতিম আছে। সে ফিরে আসবেই। চলে যান আপনি। আমি আপনাকে ঘেন্না করি। লাগবে না আমার আপনার সাহায্য।'
অহনা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে। বুকটা চৌচির হয়ে গেছে। উদাসীন লাগছে তার।
লাবণী, আদ্রিতা আসে অহনাকে নিতে। সবাই অপেক্ষা করছে তার জন্য। লাবণী অবস্থা নত দেখে আরিশকে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে! আরিশ অগ্নিরুপে তার দিকে তাকায়। লাবণী কোনো কথা না বলে অহনাকে তোলে। সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে। অহনা বলল,' মাহতিম আসেনি। ও আমাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিল। আমাকে ছেড়ে চলে গেছে সে। আমি এখন কি করব?'
' সবাই নিচে অপেক্ষা করছে, চলো।'
' না, আমি যাব না। আমি আরিশকে কখনোই ভালোবাসিনি। আমি পারব না তাকে বিয়ে করতে। মাহতিম না আসলে, আমি ম'রে যাব।'
' নিচে চলো। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি চাই না তুমি এ পরিবারের সম্মানে আ'ঘাত করো। বিয়েটা করে নাও।'
আরিশ বলল,' আমাকে ভুল বুঝোনা। আমি তেমন কিছুই করিনি। আমি শুধু মাহতিমকে ইভিল স্পিরিটের খারাপ দিকটা বলেছি। সেই তার মত বলেছে। আমি কখনোই ওর বিরুদ্ধে গিয়ে তোমাকে পেতে চাইনি। ভালোবাসাকে আমিও সম্মান করি। আমি কখনোই চাইনি তোমরা আলাদা হয়ে যাও। কিন্তু এটা প্রকৃতির নিয়ম। তাকে যেতেই হত। কেউ মৃ'ত্যুর পর থাকতে পারে না ইহজগতে।'
' তাহলে কেন এসেছিলে আমার কাছে? আমিতো তাকে চিনতাম না। কেন সে এভাবে এসে আবার চলে গেল?'
' তুমি ভুল করছিলে। তাই বাঁচাতে এসেছিল। এটা কি তার দোষ? হয়তো সে না আসলে এতদিনে তুমি বেঁচে থাকতে না। আমি তোমাদের সম্পর্কে সব জানি। আর তার প্রাণটা কিছুক্ষণের জন্য থামানো হয়েছিল বলা যেতে পারে। জ্বীনের শক্তিতে তার দেহটা টিকেছিল। কেননা তাকে আ'ঘাত করার পরও তার প্রাণ ছিল। সে কোমায় চলে গিয়েছিল। যার দরুন একজন জ্বীন তার দেহটাকে আয়ত্ত করতে পেরেছে। কিন্তু প্রকৃতির বিরোধীতা করে সে কখনোই কাউকে বাঁচিয়ে দিতে পারবে না। মাহতিম এখন পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে যাবে। তার দেহ থেকে প্রাণ চলে যাচ্ছে ক্রমশ। কেউ তাকে আটকাতে পারবে না।'
' তার মানে ও সত্যি আসবে না? আমি আর দেখতে পাব না।'
' না!'
অহনা শীতল হয়ে যায়। নিজের সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দেয়। বোবা হয়ে গেছে একদম। মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
লাবণী, আদ্রিতা ওকে বিয়ের আসরে নিয়ে যায়। আরিশ কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। সে কি বিয়েটা করে অহনাকে খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলবে? কিছুই তার মাথায় আসছে না। সে অহনার পাশে গিয়ে বসে।
অহনা এবং আরিশকে দেখে সবাই শান্ত হয়। কাজী বিয়ে পড়াতে শুরু করে। অহনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,' বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম! এক লক্ষ এক টাকা দেনমোহরে জনাব হাসমত মোড়লের বড় ছেলে আরিশ মোড়লের সাথে জনাব রোস্তম আলীর একমাত্র কন্যা অহনা তামিয়ার শুভ বিবাহ ধার্য করা হয়েছে। রাজী থাকলে বলো মা, আলহামদুলিল্লাহ।'
অহনা একদম চুপ। নিজের ধ্যানে নেই সে। তার খেয়ালই নেই সে বিয়ের আসরে আছে। নিভু নিভু চোখে সে সামনে তাকায়।
কাজী সাহেব পুনরায় বলল,' বলো, আলহামদুলিল্লাহ, কবুল করলাম।'
অহনা কোনো উত্তর দিল না। সবাই ওকে জোর করছে। কিন্তু তার কোনো সাড়াশব্দ নেই।
অনেকটা সময় পেড়িয়ে গেলেও অহনা কিছু বলল না। হঠাৎ ডুকরে উঠে,' আমি পারব না।'
বলেই অহনা সামনে তাকায়। দেখতে পায় মাহতিম অশ্রু সজল চোখে তাকিয়ে আছে। অহনার হৃদয়টা মুহূর্তেই পুলকিত হয়ে উঠে।
মাহতিম আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বাইরে চলে যায়। অহনা সহ্য করতে পারল না। বসা থেকে উঠে যায়। লাবণী তার হাত ধরে আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু অহনা তা অবজ্ঞা করে মাহতিমের কাছে ছুটে যায়।
আরিশ এখনো বসেই আছে। সে এটাই চেয়েছিল। সে চায়নি অহনা আর মাহতিম আলাদা হয়ে যাক। জোর করে সে কখনোই অহনাকে পেতে চায়না।
আয়শা, লাবণী, আদ্রিতা অহনার পিছু যেতে চাইলে আরিশ বাঁধা দেয়,' কেউ ওর পিছু নেবে না।'
অহনা দৌড়ে যায় মাহতিমের কাছে। চিৎকার করে ডাকে। কোনো সাড়া দেয় না মাহতিম। সে গন্তব্যহীন পথে হেঁটে চলে। অহনার দিকে তাকিয়েও দেখল না।
পায়ে কাঁটা বিঁধে যায় অহনার। খালি পায়েই ছুটে এসেছে। এই মুহূর্তে এই কষ্টের থেকেও বেশি কষ্ট পাচ্ছে হৃদয়ে।
চলবে....

0 মন্তব্যসমূহ