Ad Code

Ticker

6/recent/ticker-posts

গল্প ছায়া মানব । লেখক- সাথী ইসলাম । ৭৭ তম পর্ব ।



 #ছায়া_মানব

#সাথী_ইসলাম 

৭৭.

ঘরভর্তি মহিলা, একদন্ড ফাঁক নেই কোনো দিকে। ব‌উয়ের রুপের বর্ননা শুনে অনেকে দেখতে এসেছে। এক দেখায় তাদের চক্ষু তৃষ্ণা মিটছে না। তারা কেউ নিজের আসন ছাড়তে নারাজ, কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। আয়শা এসে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,' কয়জন মেয়ে ছাড়া বাকি সবাই বাহিরে গেলে ভালো হয়। ব‌উকেতো এখনো তৈরি করা হয়নি। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, কাজী এখন‌ই এসে পড়ল বলে।'


আয়শার কথায় সবাই একটু নড়ে বসে। অগত্যা বাইরে যেতেই হলো। কয়জন মেয়ে মিলে অহনা এবং রুমিকে সাজাতে থাকে। এতক্ষণ সাধারণ একটা শাড়ি পড়ে বসে ছিল। সাজ ছিল না তবে চোখে মুখে লাবণ্য ছিল। এই রুপেই সবাই কুপোকাত। না জানি ব‌উয়ের বেশে আরো কতটা মোহনীয় লাগবে!


মতি বিয়ের খুশিতে ডান্স করছে। আরিশ একপাশে বসে আড্ডা দিচ্ছে ভাইদের সাথে। আরিশের থেকে ছোট, ইন্টার পড়া খালাতো ভাই বলল,' ভাই, তুমি খুব ভাগ্যবান।'


আরিশ ব্রু উঁচিয়ে তাকায় তার দিকে,' এটা কেন বললি?'


'‌ভাবী দেখতে নাইকাদের থেকেও বেশি সুন্দরী। তোমার সাথে অনেক ভালো মানাবে। আচ্ছা এটা বলো, ভাবীর কি কোনো ছোট বোন আছে?'


' তার বোন দিয়ে তুই কি করবি?'


' ভাবীর বোনতো ভাবির মতোই সুন্দরী হবে তাই না? আছে নাকি?'


' না নেই। তার মতো সুন্দরীও আর কেউ নেই। সে একাই সব সৌন্দর্যের রানী। তার সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হয় না। যতবার দেখি, আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। সময় পেড়িয়ে যাক, আমার তাতে কোনো আগ্রহ নেই, আমি শুধু তাকে দেখে কাটিয়ে দিতে চাই সমস্ত সময়। থামিয়ে দিতে চাই সমস্ত হাকিকত।'


' এ্যাহেম, এ্যাহেম। ভাই মনে হয় কল্পনার রাজ্যে চলে গেছে!'


আরিশের হুঁশ ফিরে। কিছু্ক্ষণের জন্য সে কল্পনায়‌ই ছিল বটে। তবে তার বাঁধা নেই অহনাকে নিয়ে বলতে। আসলেই তার হবু ব‌উ সবার সেরা। এটা বলতে লজ্জা কিসের? সেতো সত্যিটাই বলছে। নিজের অজান্তেই আরিশ এসব ভেবে হেসে উঠে।


মোড়ল বাড়ির পেছনে একটি পুকুর রয়েছে। কিছুক্ষণ আগে হ্যারি ঘর থেকে বেরিয়ে বাহিরটা দেখতে গিয়ে পুকুরটা আবিষ্কার করল। মনটা তার ভীষণ খারাপ। নিজেকে সান্ত্বনা দিতে সে পুকুর পাড়ে গাছের শিকড়ের উপর বসে। গাছের সাথে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। মা কল করেছে। কথা বলে ফোনটা পকেটে গুঁজে আবারো চোখ বন্ধ করে রাখে।


আদ্রিতা সাজগোজ আপাতত শেষ করে মোবাইল নিয়ে বসে। তার বন্ধু বান্ধবীদের আসতে বলেছিল, এখনো আসেনি। সে জানালার কপাট খোলে দেখতে থাকে আসছে কিনা। এক পর্যায়ে তার চোখ যায় পুকুরপাড়ে। গাছের নিচে কিছু আছে বলে মনে হয়। যেহেতু তার ঘরটা অনেকটাই সামনে তাই আন্দাজ করতে পারছে না। দেখার কৌতুহলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বাড়ির পেছনে যায়। আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে গিয়ে দেখল হ্যারি বসে আছে। আদ্রিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে চলে যেতেই আবার লক্ষ্য করল। কেন জানি না তার খুব মায়া হলো। হ্যারির চোখ বোঁজা অবস্থায় খুব সূক্ষ্মভাবে পরখ করল। শ্যামবর্ণের এক মায়াবী পুরুষ। ঠোঁটজোড়া মৃদু নড়ছে, একদম গোলাপী। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কখনো সিগারেট ছুঁয়েও দেখেনি। আদ্রিতা তার কাছে যায়। ইচ্ছে করছে একবার ছুঁয়ে দিতে তার কোমল ঠোঁট। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না। আগে খেয়াল করেনি এমনটা, ঝগড়া করতেই উভয়পক্ষ ব্যস্ত ছিল। আজ অন্যরকম লাগছে।

কিছুটা ঝুঁকে হ্যারির মুখের সামনে নিচু হয়ে বসল। পরপরই গোলাপী ঠোঁটের দিকে চোখ যেতেই আগ্রহ বশত স্পর্শ করে।


ঠোঁটে কারো স্পর্শ পেয়ে তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে হ্যারি। একদম মুখের সামনে আদ্রিতাকে দেখে চিৎকার দিয়ে উঠে পড়ে,' তুমি এখানে?'


আদ্রিতা নিজেও তার থেকে জোরে চিৎকার দেয়। হ্যারির রা>গ হয়। সে কোনো কথা না বলে চলে যেতে চাইলেই আদ্রিতা বলল,' আরে দাঁড়াও!'


হ্যারি থমকে দাঁড়ায়,' আমার ঝগ>ড়া করার মোড নেই।'


' আমি ঝগ_ড়া করতে আসিনি।'


', তাহলে কেন এসেছ?'


' এটা আমার বাড়ি। আমি যেখানে খুশি যাব, আসব।'


' ঠিক আছে, নিজের বাড়ি আগলে বসে থাকো।'


হ্যারি আবার চলে যেতে চাইলেই আদ্রিতা তার হাত টেনে ধরে,' আমি স্যরি!'


' স্যরি কেন?'


' আমার রুড বিহ্যাভ করা উচিত হয়নি। তোমার মুখে মেহেদীও লাগিয়ে দিয়েছি। আমাকে এবারের মত মাফ করে দাও। আমি সত্যি সত্যি স্যরি!'


' তুমি স্যরিও বলতে পারো? বাহ, ভালো তো।'


' দেখো, আমি ঝ>গড়া করছি না। মিটিয়ে নিতে চাইছি। আর তুমি আবার ঝ>গড়া করতে চাইছ! আমিতো ভাব করতে চাইছি, বুঝো না নাকি?'


' মেয়েরা নাকি গিরগিটির মত মুহূর্তে রং পাল্টাতে পারে, তোমাকে দেখে সিউর হলাম।'


' আমি রা>গ করছি না তোমার কথায়। কারণ আমি ভাব জমাতে এসেছি।'


' আমি চাই না তোমার সাথে আমার আবার দেখা হোক। আমাদের রাস্তা আলাদা হলেই ভালো হয়।'


', উঁহুম! তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে। তোমার ঠোঁটজোড়া খুব সুন্দর। তাইতো স্যরি বললাম, না হয় বলতাম না জীবৎকালেও।'


হ্যারির ব্রু জোড়া কুঁচকে আসে। ঠোঁট সুন্দর বলে কেউ স্যরি বলতে আসে? কি বলছে এই মেয়ে?

' তোমার কি মাথা ঠিক আছে?'


' একদম ঠিক আছে। আরো ঠিক হয়ে যাবে যদি তুমি আমাকে বন্ধু বানিয়ে নাও।'


' না, একটা ছাগ'লকে বন্ধু বানালেও তোমাকে বানাব না।'


' তাহলে গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে নাও।'


' কিইই! আসলেই তোমার মাথা গেছে। অদ্ভুত কথা বলছ সব।'


' আমি মোটেও অদ্ভুত বলছি না। তোমার ঠোঁট সুন্দর তাই আমার তোমাকে ভালো লেগেছে। আমি কি তোমাকে প্রপোজ করব?'


' তুমি ঘরে যাও। হয়তো কিছু খেয়েছ। সমস্যা হবে খুব, ঘরে যাও।'


' তুমি কি আর্মি অফিসার?'


' না, কিছুদিন আগেই জয়েন করেছি।'


আদ্রিতা আনন্দে নেচে উঠে। হ্যারিকে টেনে নিয়ে নাচতে থাকে। আনন্দে ফেটে পড়ছে। হ্যারি থামাতে পারছে না তাকে। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল কেউ আছে কিনা। মেয়েটার পাগলামী দেখে হ্যারির তাকে মানসিক রোগী মনে হয়। আদ্রিতা হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,' এ তো জল না চাইতেই মেঘ। তুমিই আমার বয়ফ্রেন্ড। বিয়ে করলে তোমাকেই করব!'


হ্যারি এক ঝট>কায় আদ্রিতার থেকে নিজের হাত সরিয়ে নেয়,' মাথা গেছে তোমার। আগে ভাবতাম বুদ্ধি নেই এখন দেখছি ল'জ্জাও নেই।'


হ্যারি তড়িঘড়ি হয়ে চলে যেতেই আদ্রিতা বলে উঠল,

'রাতে মশা, দিনে মাছি-

আমি তোমাকে ভালোবাসি!'


হ্যারি কান না দিয়ে চলে যায়। তাতে কি আদ্রিতা মহা খুশি। মনের মত কাউকে পেয়ে গেল। যেভাবেই হোক তাকে নিজের করেই ছাড়বে, এই হলো প্রতিজ্ঞা। মুখ ভার করে আবার হেসে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।


অহনা, রুমিকে সাজানো হলো। লাল বেনারসী, লাল লিপস্টিকে তাকে হাজারগুন সুন্দর লাগছে। 

সাজিয়ে দিয়ে মেয়েগুলো চলে গেল। সময় মত কেউ এসে ব‌উ নিয়ে যাবে। 


মাহতিম এতক্ষণ ছিল না। সাজগোজ শেষে সে অহনাকে দেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। চোখের পলক একবারের জন্যও পড়ছে না। অহনা রুমিকে রেখে বারান্দায় চলে আসে। ঘরে কথা বললে রুমি দেখে যাবে বলে।

অহনা শাড়ির আঁচল ঠিক করে বলল,' দেখো মাহতিম আমাকে কেমন লাগছে?'


মাহতিমের মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না। চোখের সামনে অহনাকে দেখে তার মুখের কথা ফুরিয়ে গেছে। এক হাত দিয়ে অহনার গাল স্পর্শ করে। অহনা মাহতিমের হাত ধরে চোখ বন্ধ করে নেয়।

মাহতিম অহনার ঘোমটাটা আরো কিছুটা টেনে দেয়,

'ঠিক সেদিনের মতো লাগছে তোমাকে! আমাদের প্রথম বিয়ের সময়টা যেন এখন। আমার কি ভাগ্য দেখো, সব অপূর্ণ থেকে যায়।'


' আর কিছুই অপূর্ণ থাকবে না। কিছুটা সময় পরেই আমরা এখন হয়ে যাব। আমারতো বিশ্বাস‌ই হচ্ছে না। অবশেষে আমি তোমাকে পেয়ে যাব। খুশিতে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।'


' এই খুশি সারাজনম থাকুক।'


মাহতিম চোখের জল লুকিয়ে নেয়। ঢোক গিলে ভেতরের কষ্টটাকেও হজম করে নেয়। অহনা বুঝতে পারে, মাহতিম কাঁদছে,

' তুমি কাঁদছ?'


' এটা খুশির কান্না।'


অহনা মাহতিমের চোখের জল মুছে দেয়,

' এভাবে কেঁদো না।'


' একবার জড়িয়ে ধরো।'


আজ প্রথম মাহতিম নিজে থেকে বলল তাকে জড়িয়ে ধরতে। পুনরায় হাত বাড়িয়ে দেয়,' আমি তোমাকে অনুভব করতে চাই।'


অহনা ঝাপটে ধরে মাহতিমকে। শক্ত করে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে। কেঁদে উঠে মাহতিম। ভেতর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসছে তার। বুকের ভেতরটা চিনচিন করছে। তীব্র ব্যথায় হৃদ কেঁপে উঠে। আর পারছে না সহ্য করতে। ভেতর থেকে নির্বাক শব্দ আসছে,' আমি সহ্য করতে পারছি না আমার আহি। আমি পারছি না সহ্য করতে। আমার এসব সহ্য হচ্ছে না একদম।'


অহনা বলল,' এভাবে বাচ্চাদের মত কাঁদলে আমার কষ্ট হয়। এখন উপযুক্ত সময়। চলো, আমরা জানালা দিয়ে বাইরে চলে যাই। লাবণী ঠিক মেনেজ করে নেবে। রুমিকে বের করার ব্যবস্থা করছি আমি।'


' আর একটু পর। তুমি বিয়ের আসরে গিয়ে বসো আগে।'


' সেখান থেকে সবার সামনে কিভাবে কি করব?'


' কিছু করতে হবে না। যা করার আমি করব। তুমি যাও।'


অহনা আর রুমিকে নিতে আসে মেয়েরা। লাবণী এসে অহনাকে দেখে অবাক হয়ে যায়। কানে কানে এসে বলে,' তোমারতো চলে যাওয়ার কথা ছিল। গেলে না কেন? তুমি আবার আরিশকে বিয়ে করতে চাও নাতো?'


অহনা আশ্বাস দেয়,' আরে না। মাহতিম এখানেই আছে। সে সব ব্যবস্থা করে নেবে। আমাকে যেতে বলেছে। জানি না কি করবে। আমার খুব ভয় হচ্ছে। কিন্তু তবুও, আমি তাকে বিশ্বাস করি। হয়তো অন্য কোনো প্ল্যান আছে।'


অহনাকে নিয়ে যাওয়া হয়। মাহতিম শুধু ভাঙা হৃদয় নিয়ে দেখে তাকে।

সহ্য করতে পারছে না। ঘুরে দাঁড়ায়, পশ্চিমে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ভেতর থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে। ভালোবাসা না পাওয়ার আর্তনাদ। পেয়েও না পাওয়ার আর্তনাদ। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে। বসে পড়ে মাটিতে,' আমার সহ্য হচ্ছে না আহি। আমি পারছি না সহ্য করতে। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার, খুব।'

মাহতিম ছুটে যায় অহনার কাছে। সে পারবে না অহনাকে অন্য কারো হতে দিতে। কখনোই না। ভালোবাসাকে কখনোই অন্যের হাতে সে তুলে দেবে না।


চলবে....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Ad Code